পোড়া দাঁত

প্রকাশিত: 4:07 PM, July 18, 2021

শান্তা ফারজানা:

বৃদ্ধা কী যেন খুঁজছে। উদ্ভ্রান্তের মতো। চারিদিকে মাংস পোড়ার উৎকট গন্ধ। ‍সারি সারি লাশ। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাদা মোটা কাপড়ের বস্তায় কোনরকমে মোড়ানো। কোন লাশের বিগলিত পা বেরিয়ে আছে। কোনটার বেরিয়ে আছে আঙুলবিহীন হাত। আলগা হয়ে আছে পোড়া কালো চামড়া। কোন কোন লাশের গলিত মাংসে আটকে আছে সফেদ কাপড়। ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের মর্গে যেন অগ্নিদগ্ধ লাশেদের মিছিল।

মানুষের হাড়মাস-চুল-কাপড় পোড়া গন্ধে ভারী চতুর্দিকের বাতাস। এরই মধ্যে লাশের কয়লাসম চেহারায় কী যেন খুঁজেই চলেছে বৃদ্ধা। লাশের কুঁচকে যাওয়া চামড়ায় গড়িয়ে পড়ছে বৃদ্ধার চোখের পানি। ফোটায় ফোটায়।

‘দাঁত কই? দাঁত…. দাঁত…’ বলতে বলতে মর্গের ধুসরিত মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে বৃদ্ধা। পঞ্চান্ন কি ছাপ্পান্ন বছর বয়স তার। পরনে রুপালি জরির পাড়ের সবুজ বর্ণের শাড়ি। দারিদ্রের কষাঘাতে আর দিনের পর দিন পরিধানের বাধ্যবাধকতায় একসময়ের চকচকে রুপালি বর্ণ বিবর্ণ হয়ে গেছে। সুবজাভ রংয়েও নেই আগের মতো ঔজ্জল্য। খুলে গেছে মাথার কাঁচা-পাকা চুলের বাঁধন । মুখের সার্জিক্যাল মাস্কের নীল রং ধুলা আর বিগলিত পোড়া দেহাবশিষ্টাংশ লেগে লেগে কালচিটে হয়ে গেছে। রুগ্ন হাতে কপালের উপর পড়ে থাকা চুল সরায় বৃদ্ধা। ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে আছে আগুনে পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়া একটি মরদেহের হাতের আঙুলের উপর। আঙুলটাতে একটা পিতলের আংটি। পুড়ে মাংস খসে যাওয়া হাড় আর চামড়া সর্বোস্ব আঙুলের সাথে আটকে আছে আংটিটা।

এই নাও, আমার ভালোবাসার চিহ্ন। সবসময় যত্ন কইরা রাইখো। বলে মরিজান বিবির ডান হাতের মধ্যমায় একটা পিতলের আংটি পরিয়ে দিলো শওকত মিয়া। আংটিটার মাঝখানে একটা লাল পাথর। শওকত মিয়ার হাতেও একই রকম একটা আংটি; কেবল পাথরটা সাদা। মরিজান আর শওকতের দিন অনেক সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে কাটছিল। পুকুরের শিং-কই, উঠানের মাচার লাউ-সিম-শাক, হাঁস-মুরগির খোয়ারের ডিম-অভাব ছিল না কোন কিছুরই। এমনকি নিজেদের বিঘা বিঘা ধানি-জমির মণ কে মণ ধান থেকে যে চাল পেত তা নিজেরা খেয়ে বুভুক্ষ প্রতিবেশীদের দেয়ার পরেও আরো অনেক থেকে যেত যা বিক্রি করে বেশ টাকা পেত শওকত। কিন্তু, টাকা জমানোর স্বভাব ছিল না মানুষটার। কে কোথায় কোন কষ্টে আছে তার খোঁজ করতো সবসময়। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ঘোঁচাতে তার চেষ্টার কমতি ছিল না কোন। মরিজান বিবি কখনোই স্বামীর কোন সিদ্ধান্তে বাধা দিতো না। বরং সাথে থাকতো সবসময়। বিয়ের আট বছর পর তাদের ঘর আলো করে ছেলে সন্তানের জন্ম হলো। আনন্দে আত্মহারা হয়ে আশেপাশের সবাইকে দাওয়াত করে খাওয়ালো শওকত। গরুর গোশত, চিকন চালের ভাত আর ঘন ডাল। তারপর দই-মিষ্টির পসরাও। সবাই আঙুল ডুবিয়ে খেল। দোয়া করলো দু’হাত তুলে।

কিছু মানুষ থেকেই যায় হিংসার চরকায় মিহি সুতো কাটতে। এরা মুখে আন্তরিকতার বুলি আওড়ালেও, অন্তরে লালন করে চরম বিষ। এমনই কারো ‍কৃষ্ণ-নজরের ঝড়ে বিচূর্ণ হয়ে যায় মরিজান-শওকতের গোছানো সংসার। ‍একদিন দুপুরে কে বা কাদের সাথে ’‘মাছ ধরতে যাই’ বলে আর ফিরে আসেনি শওকত মিয়া। পাড়ার মানুষ বলাবলি করলো- নৌকা সমেত নাকি ডুবে গেছে শওকত। বিলীন হয়ে গেছে নদী গর্ভে। মরিজান বোঝে না; ঝড় নাই, বাদল নাই, নৌকা কেমনে ডুবে! আর কেউ ডুবলো না, কেবল শওকতই ডুবে গেল! হারিয়ে গেল তার প্রাণের স্বামী; চিরদিনের মতো। লেখাপড়া না জানা, সরল-সোজা মরিজান যেন হঠাৎ করেই পড়ে গেল অথই সাগরে। ‍

ছোট্ট ছেলেটাকে নিয়ে খাবি খেতে থাকলো। শওকতের দুরসম্পর্কের ভাইরা এসে একে একে দখল করে নিলো সকল জমি-সম্পদ, বাদ গেল না পুকুরও। দিশেহারা মরিজান অবশেষে বিতাড়িত হলো স্বামীর ভিটে থেকেও। ভাসমান মানুষ যেমন খড়-কুটো পেলেও বাঁচার আশায় আকড়ে ধরে; ঠিক তেমনি সালেহাকে পেয়ে ডুকরে কেঁদে উঠে মরিজান।

পাশের গ্রামের সালেহাও স্বামী পরিত্যাক্তা চরম দুঃখী। শওকত জীবিত থাকতে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছিলো সালেহাকে। তার মৃত্যুর পর সেও এখন অসহায়। কিন্তু কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ সালেহা নিজের আর মরিজানের জীবন ও জীবিকার উপায় খুঁজতে শুরু করে। চেষ্টা ও সবুরে মেওয়া ফলেই। চার কিলোমিটার পায়ে হেঁটে বাজারে গিয়ে জ্যাঠাতো ভাইকে ফোন করে সাহায্য খুঁজতেই উপায় পেয়ে যায় সালেহা।

নিজের জমানো সামান্য টাকায় মরিজানকে সাথে নিয়ে পাড়ি জমায় ঢাকার নারায়ণগঞ্জে। জ্যাঠাতো ভাই তাদের নিয়ে যায় একটা জুস কারখানায়। সুপারভাইজারের সাথে পরিচয় করিয়ে কাজ পাইয়ে দেয়। পায়ে হাঁটা পথের দুরত্বে এক বস্তিতে মাসিক পাঁচশ টাকায় থাকবার জন্য ঠিক করে দেয় এক রুম। শুরু হয় মরিজান এবং সালেহার নতুন জীবন। ‍

অঝোরে কাঁদছে বৃদ্ধা। কোন শব্দ নেই; নীরব সেই কান্না। কেবল কেঁপে কেঁপে উঠছে। মর্গের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখেও বেদনার জল। এরা সবাই নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে। সবাই নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জের এই জুস কারখানায় কাজ করতো। হঠাৎ বিকাল সাড়ে ৫টায় আগুনের সূত্রপাত হয়। ওই সময় কারখানা ভবনটিতে প্রায় চারশ’র বেশি কর্মী কাজ করছিল। কারখানায় প্লাস্টিক, কাগজসহ মোড়কিকরণের প্রচুর সরঞ্জাম থাকায় আগুন মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। প্রচুর পরিমাণ দাহ্য পদার্থ থাকায় কয়েকটি ফ্লোরের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিটের দীর্ঘ সময় লাগে।

আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর,পরদিন দুপুর সোয়া একটা পর থেকে কারখানার ভেতরে থেকে লাশ বের করে আনতে থাকেন উদ্ধারকর্মীরা।মোট ৫২ জনের লাশ উদ্ধার হয়।মরিজান বিবিও এই কারখানায় কাজ করে প্রায় বাইশ বছর।সে আর সালেহা একসাথে কাজ শুরু করলেও সালেহা পাঁচ বছরের পর আর কাজ করতে পারেনি।ভীষণ জ্বরে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে যায় সে।সালেহার বোনের মেয়ে রানীকে তখন নিজের ছেলে সাফকাতের সাথে একসাথে মানুষ করতে থাকে মরিজান।রানীকে নিজের ছেলের চেয়েও বেশি ভালোবাসতো মরিজান।

দুইজনের সম্পর্ক মা-মেয়ের মতোই অন্তরঙ্গ ছিল।একদিন রাস্তা পার হতে গিয়ে রিকশার সাথে বাড়ি খেয়ে পাশের আইল্যান্ডে পরে রানীর সামনের চারটা দাঁত অর্ধেক করে ভেঙে যায়।সেই ঘটনায় রানীর চেয়ে মরিজানই কেঁদেছিল বেশি।ব্যথাটা রানী পেয়েছিল দাঁতে,আর মরিজান অন্তরে।দিন গেলে সাফকাত আর রানীকে বিয়ে দিয়ে একসাথেই থাকতে শুরু করে।রানী আর সাফকাতও মরিজানের সাথে জুসের কারখানা।

শ্রমিক দর্পণ/এমএম