লকডাউন নয়, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত ও পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহই হোক লক্ষ্য

প্রকাশিত: 3:15 PM, July 15, 2021
মিথিলা আকন্দ, লেখক ও শিক্ষক

শিক্ষক ও লেখক, মিথিলা আকন্দ:

করোনায় দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। নিয়মিত বেতন পাচ্ছেনা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা। সবচেয়ে কষ্টে আছে নিম্নবিত্ত মানুষ আর বেসরকারি শিক্ষকেরা। কেউ কেউ খরচ কমানোর জন্য খাবারের তালিকা থেকে দুধ ডিম বাদ দিয়ে বেঁচে থাকার মতো খাবারকে বেছে নিয়েছে। তৈরি হচ্ছে পুষ্টিহীনতা। ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার বাইরে থাকতে থাকতে একেকজন একেকটায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। পরিবারের উপার্জনকারী ব্যক্তির আয় যখন কমে তখন সেই পরিবারে নিত্য কলোহ, দুঃশ্চিন্তা, লেগেই থাকে। মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পরে পরিবারের সদস্যদের।

এসব বলার কারণ, করোনা যে শুধু আমাদের আয় রোজগার কমিয়ে দিয়েছে তাই না, সামগ্রিকভাবে বহু দিক থেকে ক্ষতি করেছে। বোধের কষ্ট বড় কষ্ট। আমরা যারা মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত, আবার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক তাদের এই বোধের কষ্টেই মৃত্যু হচ্ছে। তারপর গোদের উপর বিষফোঁড়া এই লকডাউন। নামের নাম লকডাউন। গরীব মারা লকডাউন। রাস্তায় বের হলে দেখবেন পুরো রাস্তায় জ্যাম, শুধু বাস বন্ধ। এখন এমনিই লোকজনের আয়ের বেহাল দশা। তার উপর তিন গুণ চার গুণ ভাড়া গুণতে হচ্ছে। পরিবহন বন্ধ থাকায়, গাদাগাদি, চাপাচাপি, ঘেষাঘেষি করে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। এতে সংক্রমণ কমার বদলে বাড়ছে।

করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে মানুষ সাধারণ রোগের চিকিৎসা খুব কমই করিয়েছে। করোনার জন্য হাসপাতালে যায়নি, বা আয় কমায় যাওয়া হয়নি। তারপর এই লক ডাউনের নাটকে মাইলের পর মাইল ভোগান্তি সয়ে অফিস যাওয়া, এটা যে একজন অসুস্থ মানুষের জন্য কত বড় শাস্তি, তার প্রমাণ আমি নিজেই। এখন চিত্রটা এমন হয়েছে ভোগান্তি ই যেন করোনার ফ্যাশন। করোনা মহামারী একটি বৈশ্বিক সমস্যা। মহামারী শব্দটার সাথে একটা জীর্ণ ছবি চোখে ভেসে ওঠে, সেটা দারিদ্রতার, অসুস্থতার, ক্ষুধার। সুতরাং উপরে যা লিখেছি, সেগুলো যে ঘটবে তা খুব স্বাভাবিক। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের নীতি নির্ধারকেরা কি জানে? দেশ থেকে কবে করোনা বিদায় নিবে?

শুধু এরা কেন, বিশ্বের কেউ কি সেটা বলতে পারবে? না। একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে সরকারের কাছে জানতে চাই, তাহলে দফায় দফায় এই লকডাউনের নাটকের মানে কী? করোনা ভাইরাসসহ অন্যান্য রোগের বিস্তার সীমিত পর্যায়ে রাখতে মাস্ক সাহায্য করে। এটা পরিক্ষিত প্রমাণিত। যেখানে শুধু ভালো মানের মাস্ক পরে ৯০ % করোনা থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব, সেখানে এইভাবে লকডাউন দিয়ে মানুষগুলির আর্থিক, মানসিক, ক্ষতি করার উদ্দেশ্য কী? আপনারা কী চান? আপনাদের পরিকল্পনাটা আসলে কী? বা আদৌ আপনাদের কোন সঠিক পরিকল্পনা আছে কিনা, বিগত দিনগুলোতে ছিল কিনা সে ব্যাপারেও আমি সন্দিহান। কারণ আপনারা ত্রাণ দিয়েছেন সেই ত্রাণ আপনাদের দলের লোকেরাই চেটেপুটে খেয়ে নিয়েছে।

করোনাকালীন বিপর্যয়ে বাহাত্তর হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রনোদনা দিয়েছেন, সেই টাকা কতটা সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছেছে সেখানে ও একটা জিজ্ঞাসা চিহ্ন থেকেই গেছে। লকডাউন দেওয়ার আগেই লকডাউন লকডাউন ট্রায়াল শুরু করে মানুষকে উচ্চ সংক্রমণের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। কখনো লকডাউন দিয়ে ট্রেন, বাস, ফেরি চালু রেখেছেন আবার কখনো লকডাউন দেওয়ার আগে ট্রায়াল দিয়েছেন। এইসব কেমন প্রহসন, কেমন পরিকল্পনা, কাদের স্বার্থে এইসব পরিকল্পনা সবেতেই সেই জিজ্ঞাসা প্রশ্ন! হাতে খাটি মুখে খাই, আমরা সেই দেশের মানুষ। বছরের পর বছর আমাদের লকডাউন উদযাপন সম্ভব নয়।

এদিকে আমাদের দেশের দুর্নীতির যে অবস্থা, তিনতলা থেকে তিনশ টাকা উড়িয়ে দিলে নীচে পড়তে পড়তে তা তিন টাকা হয়ে যায়, সেই দেশে এইসব ত্রাণ, প্রনোদনা সব নাটক মাত্র। আমরা এই নাটকের অংশীদার হতে চাইনা। কর্ম করে খেতে চাই। দয়া করে এই লকডাউন নামক বিভীষিকাময় শব্দটি থেকে বেড়িয়ে আসুন। স্বাস্থ্য বিধি মানাতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করুন। কাজ করতে দিন। ভ্যাকসিন নিশ্চিত করুন। বেড়িয়ে আসুন টিকা বানিজ্য থেকে। চারিদিকে তাকিয়ে দেখুন আমরা কেউ ভালো নেই। শুধুমাত্র সরকারি চাকরিজীবী ছাড়া আর কেউ ভালো নেই। যত ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন লকডাউন মানাতে, ততটা ক্ষমতা স্বাস্থ্যবিধি মানাতে প্রয়োগ করুন।

এফএফপি-থ্রি মাস্ক, এর সরবরাহ বাড়ান। প্রয়োজনে ঘরে ঘরে এই মাস্ক পৌঁছে দিন। এই মাস্ক সম্পর্কে বলা হয় যে, সার্স এবং অন্যান্য মারাত্মক ভাইরাসগুলো থেকে বাঁচাতে পারে এটি। জীবনে স্বাভাবিক গতি আনতে দিন। এভাবে আর পারছিনা। একা না খেয়ে থাকা যায়, কিন্তু পরিবার নিয়ে যায়না। আমাদের সবার পরিবার আছে, পরিবারের মানুষের শুকনো মুখ কারবালার ময়দানের মতো হাহাকার জাগায় মনে। তখন রোগ আর মৃত্যুর ভয় কাজ করেনা।

সরকারের যারা নীতি নির্ধারক আছেন তাদের কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা আমাদের বাঁচতে দিন। আমরা মরে যাচ্ছি এই লকডাউনের চক্করে। মাস্ক যারা পড়েনা, প্রয়োজনে তাদের হাজত বাস দিন, জরিমানা করুন। আরও কঠোর হওয়ার প্রয়োজন হলে হোন। তবু লকডাউন আর না। স্বাস্থ্যবিধি মানানো আর টিকার নিশ্চয়তাই হোক আপনাদের পরিকল্পনার সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এমএমটি/শ্রমিক দর্পণ