করোনাকালীনে দেশের অর্থনীতির ঢাল ইপিজেড, বাড়ছে ক্রেতাদের চাহিদা

প্রকাশিত: 8:03 PM, June 1, 2021

নিজস্ব প্রতিবেদক,  সাভার

পাটজাত শিল্প যখন তলানিতে, তখন বাংলাদেশের আশির্বাদ হয়ে এসেছে পোশাক শিল্প। করোনার তান্ডবে বিশ্বের বড় বড় দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। তখন বাংলাদেশের অন্যতম আয়ের উৎস বাংলাদেশ রপ্তাণি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ’ইপিজেড’ শক্তহাতে হাল ধরেছে অর্থনীতির। করোনার মহামারিতেও দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত ৮ টি ইপিজেড একের পর এক চমক দেখাচ্ছে অর্থনীতি খাতে। বিনিয়োগে আকর্ষণ, রপ্তানী বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বেপজা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম ঢাকা ইপিজেড।

১৯৯৩ সালে রাজধানীর অদূরে সাভারে ঢাকা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার পর থেকে এর অভাবনীয় সাফল্য এবং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহে ১৯৯৭ সালে ২১৪.৩৪ একর জমির উপর এর সম্প্রসারণ করা হয়। উদ্যোক্তাদের সাথে যোগাযোগসহ সরকারের বিনিয়োগ বান্ধব নীতির কারণে ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাদীর কারনে ঢাকা ইপিজেড দেশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পছন্দের স্থান। সৌহার্দ্য ও শান্তিপূর্ণ দলবদ্ধ উৎপাদনমূখী কর্ম পরিবেশই হচ্ছে এই ইপিজেডের মূল চালিকা শক্তি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে ঢাকা ইপিজেডে ৯৪ কারখানা রয়েছে। বন্ধ রয়েছে ৪ টি কারখানা। এসব কারখানায় উৎপাদনে যেতেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বেপজা কতৃপক্ষ। আর এসব কারখানায় প্রায় ৭৫ হাজার শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন ।

বেপজার দেওয়া তথ্যমতে, ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের  এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা ইপিজেড থেকে মোট রপ্তানি হয়েছে ১৭৮৯.৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২১ সালের মার্চ মাসে ঢাকা ইপিজেড থেকে মোট রপ্তানি হয়েছে ১৫৭.৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর এপ্রিলে রপ্তানী হয়েছে ১৪৭.৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এতে করে মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে রপ্তানি কমেছে ১০.২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ডিইপিজেড গেট

অন্যদিকে বেপজাধীন ৮ টি ইপিজেডে ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট রপ্তানি হয়েছে ৮৫,৩৭১.৬৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে শুধু ঢাকা ইপিজেড থেকে রপ্তানি হয়েছে ৩০,০৩২.৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। নতুন করে ৭১ টি কারখানা চালুর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এছাড়া করোনাকালীন সময়ে ৮ টি ইপিজেডে মোট ৩০ হাজার নতুন শ্রমিক নিয়োগ হয়েছে।

এদিকে ১৯৯৩-৯৪ সালে ডিইপিজেড শুরুর অর্থবছরে বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৮.২২ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু এরপর থেকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৯৯-২০০০ সালে বিনিয়োগ ছিল ১৪৩.৪৯ মিলিয়ন ডলার। এর দশ বছর পর ২০০৯-১০ অর্থবছরে বিনিয়োগ দাঁড়ায় ৭১৩.৫৫ মিলিয়ন ডলারে। এবং সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ হয়েছে ১৫২৫.৪৫ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ গত দশ বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি হারে।  এ ছিল ঢাকা ইপিজেডে বিনিয়োগের হার।

আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তাদের কাছে দেশের ইপিজেডসমূহ এখন বিনিয়োগের স্বর্গভূমি হিসেবে পরিগণিত এবং প্রশংসিত। স্বল্পতম উৎপাদন ব্যয়, শান্তিপূর্ণ স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা এবং শিল্পবান্ধব কর্মপরিবেশের ফলে বিশ্ববাজারে বেপজা এখন একটি ব্র্যান্ড। সরকারের উদার বিনিয়োগ ও শিল্পনীতির ফলে বর্তমান সরকারের অধীনে বিগত ১২ বছরে বেপজা বিনিয়োগ, রপ্তানি ও বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেশ সাফল্য অর্জন করেছে।

বর্তমানে অসংখ্য বিদেশী ক্রেতা রয়েছে ইপিজেডে। বিশ্বের বিভিন্ন ব্রান্ডেড পণ্যগুলো তৈরি হচ্ছে এখানেই। নাইকি, রিবক, লি, অ্যাডিডাস, ইন্টার স্পোর্টস, লাফুমা, গ্যাপ, জেসি পেনি, ওয়ালমার্ট, কেমার্ট, আমেরিকান ইগল, এইচ অ্যান্ড এমসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। সারা বিশ্বে নাইকি, পুমা, পলো, ইন্টার স্পোর্টস, রালফ লরেন ব্র্যান্ডের যে পরিমাণ পণ্য চাহিদা রয়েছে, তার বেশিরভাগই তৈরি হয় বাংলাদেশের ইপিজেডে। বিগত কয়েক বছরে দেশের মোট জাতীয় রপ্তানীতে বেপজার অবদান প্রায় ২০ শতাংশ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে অবদান রয়েছে ৮.৮৫ শতাংশ।

ইপিজেড বিনিয়োগে পণ্যের বৈচিত্রায়ণে উৎসাহিত করায় পোশাক শিল্পেরে বাইরেও ঢাকা ইপিজেডে অনেক কিছুই উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে- অটো কার পার্টস, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য যেমন- জুতা, ব্যাগ, ডিসপোজিবল প্লাস্টিক সিরিঞ্জ, এপ্রোন,  ক্যাপ, ইলেকট্রনিক্স চিপস, লেবেল, পেপার প্রোডাক্ট, মেটাল বাটন, প্লাস্টিক পণ্য, গার্মেন্টস এক্সেসরিজ যেমন- হ্যাঙ্গার, বারকোড, সুতা, জিপার, রিবন, বাটন, প্রাইস টিকেট, করোগেটেড কার্টন ইত্যাদি, টেক্সটাইল, প্রটেকটিভ ক্লোদস, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, ডেনিম পণ্য, মোটর বাইক কভারসহ সোয়েটার।

দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং জাতীয় রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বেপজার অধীনে ইপিজেডসমূহ তথা ঢাকা ইপিজেড দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাপক অবদান রাখছে। শুধু তাই নয় শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সামাজিক, নিরাপত্তা, এবং কর্ম প্রণোদনা বিষয়ে প্রতিনিয়ত সচেতন করা হয় এখানেই।

যার ফলাফল স্বরূপ সাভার ইপিজেড এর সংলগ্ন এলাকায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে গড়ে ওঠেছে  স্যাটেলাইট টাউন (Satellite Town) ব্যাকওয়ার্ড  অ্যান্ড ফরওয়ার লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রিজ (Backward and Forward Linkage Industries), এক্সেসইরিজ ইন্ডাস্ট্রিজ (Accessories Industries) সহ পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, টেলিযোগাযোগ, বীমা, এজেন্ট, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, হোটেল, হাউজিংসহ অন্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানসমূহ ব্যবসার মাধ্যমে দেশের আর্থিক উন্নয়নে এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে পরোক্ষভাবে যথেষ্ট অবদান রাখছে।

ডিইপিজেডের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন পোশাক শ্রমিক রাসেল। তার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমি গ্রামে থাকা অবস্থায় আমার পরিবারে অনেক অভাব অনটন ছিল। দুই বেলা দুই মুঠো খাবার খেতে পারতাম না। ঢাকায় এসে ইপিজেডে কাজ নিয়ে বাড়িতে ইট দিয়ে আধাপাকা ঘর দিয়েছি। এখানে খুব ভালই চলছি। ইপিজেড না থাকলে আমরা এখনও আগের অবস্থায় থাকতাম। হয়তো এখনও দুই বেলা খেতে পারতাম না।

ইপিজেডের অপর পোশাক শ্রমিক আয়েশা বলেন, ‘আমাদের পরিবারের  ৪ সদস্য এখানেই কাজ করি। আমরা খুব ভাল আছি। ইপিজেডে কাজে পরিবেশ অনেক ভাল। ইপিজেড না হলে আমাদের কর্মসংস্থান হতো না। ইপিজেড আমাদের জন্য আশির্বাদ।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বস্ত্র ও পোশাক শিল্প শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সারোয়ার হোসেন বলেন- ইপিজেড বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রান। ইপিজেডের কারনে পোশাক শিল্পের রপ্তানীর ধারা বজায় রয়েছে। যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত ভূমিকা রাখছে। ইপিজেড স্থাপন না হলে হয়তো করোনাকালে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরতো। ইপিজেড স্থাপন হওয়ায় করোনা কালেও রপ্তানীর ধারা বজায় রয়েছে।

ডিইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক আব্দুস সোবাহান বলেন, আমাদের ডিইপিজেডে গত মাসের তুলনায় রপ্তানী কিছুটা কমেছে। তবে এর আগে করোনার সময়েও বেশী রপ্তানী হয়েছে। ক্রয়াদেশেও ধীরে ধীরে বাড়ছে। আগামীতে আরও বাড়বে বলে আমার বিশ্বাস। ডিইপিজেডের সঠিক তত্ত্বাবধান এবং সকল ধরণের ইউটিলিটি সার্ভিসসহ স্বার্বিক সুযোগকে কাজে লাগাতে পেরেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, করোনাকালীন সময়ে শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে ইপিজেডে উৎপাদন চালু রয়েছে। গত বছরের মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত ডিইপিজেডে একজন শ্রমিকও করোনায় আক্রান্ত হয় নি। আমরা শতভাগ স্বাস্থ্য বিধি মেনে কাজ করছি বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ঢাকা ইপিজেডের বাইরেও সাভারে অন্তত হাজারেরও বেশি শিল্প কারখানা রয়েছে। ইপিজেড গড়ার পর থেকে এসব শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানাও দেশের অর্থনীতি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়েও তারা শ্রমিকদের কর্মমুখী রেখেছেন ও বিদেশী ক্রেতাদের ক্রয়াদেশের চাহিদা মিটিয়ে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে চলেছে।