সীমা-দ্য লিমিটেশন

প্রকাশিত: 6:17 PM, May 8, 2021

কথা সাহিত্যিক র‌্যাক লিটন

সৃষ্টির সূচনালগ্নেই সীমা লঙ্ঘনের শাস্তি দিতে মানুষকে পৃথিবীতে পেরণ করেন মহা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। পৃথিবীতে প্রেরণের পর আবারও সৃষ্টিকর্তার কঠোর হুসিয়ারী “তোমরা সীমা লঙ্ঘন করো না”। সৃষ্টির সূচনায় মানুষ ছিল মহান সৃষ্টিকর্তার পূজারী জ্ঞানহীন জীব। আদেশ লঙ্ঘনে মানুষকে জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন সৃষ্টিকর্তা। সেই সাথে, সীমা লঙ্ঘনের জন্য মারাত্মক প্রতিশোধের হুসিয়ারীও প্রদান করেন। তদুপরী জ্ঞান-বুদ্ধি সমৃদ্ধ মানুষ সীমা লঙ্ঘন করছেই।

খাদিম গ্রামের সব চেয়ে ধনী ব্যক্তি এবং ক্ষমতাবান। শত শত একর ধানী জমির মালিক। বাড়ির সামনে-পিছনে সাতটি পুকুর। গোয়াল ভরা গরু, মহিশ। তিনটি ঘোড়া উঠানে সব সময় দন্ডায়মান। মাঠে এবং বাজারে যাওয়ার জন্য ঘোড়ায় চড়েন খাদিম। বংশ পরস্পরায় রীতি চলছে এই পরিবারে। তিনটি বড় বড় উঠান নিয়ে বাড়ি। রাজবাড়ির মত সান বাঁধানো মহিলা ও পুরুষের জন্য আলাদা ঘাট। বাড়ির মধ্য উঠানে বিরাটাকার সাতটি ধানের গোলা। বাপ দাদার ভিটেবাড়ি। তিনটি উঠান পার হয়ে বাড়ির সর্ব দক্ষিনে কাচারী ঘর। গ্রামের সকল শালিস-বিচার খাদিম কাচারী ঘরেই করেন। এক সময় খাদিমের বাবা এই কাচারী ঘরেই বিচার সালিশ করতেন। বাবা ছিলেন পাকিস্তানী নায়েব। বাবার মৃত্যুর পর, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে খাদিম প্রভাব খাটিয়ে করেছে অত্যাচারের রাজত্ব। সেই প্রভাব আজও বিদ্যমান। ন্যয়-নীতির তোয়াক্কা না করে খেয়াল খুশি মত সালিশ-বিচার করে নিজের অস্তিত্বের প্রমান দেখায় খাদিম। কারও কথার মূল্য নেই তার কাছে। তিনি গ্রামের স্বঘোষিত বিচারক ও মাতব্বর। বিচারের সময় কেউ তার বিপক্ষে কথা বলতে পারেনি। তিনি যা বিচার করবেন তাই আইন। গ্রামের আইনের সংবিধান প্রণেতা তিনি নিজেই। তার আইন ভঙ্গ করার ক্ষমতা গ্রামে কারও নেই। তার বিপক্ষে কথা বললেই ফলাফল হয়েছে মারাত্মক। সকালে পাওয়া যেত, গলা কাটা লাশ অথবা মাথা থেতলানো মৃত্যু দেহ। প্রমান করা যায়নি, কে এই হত্যাকান্ডের নায়ক! নিজের হাতেই গলা কেটে, অন্য জনের বিচার করেন খাদিম। গ্রামে সহজ সরল মানুষ বুঝতে পারলেও, সহ্য করে থেকেছেন বছরের পর বছর। তিনিই সর্ব বিচারকের স্থান দখল করে অত্যাচার করছে নির্দিধায়, যেন এটা খাদিমের অঙ্গ রাজ্য। তিনিই এই রাজ্যের একমাত্র অধিপতি।

রাজা বাদশারা যেমন সেনা বেষ্টিত থাকতেন, সেইরূপ খাদিমের সেনা না থাকলেও আছে বিশ সদস্যের লাঠিয়াল বাহিনী। নিজের অপশক্তি প্রয়োগেই তার এই লাঠিয়াল বাহিনী। কাচারী ঘরের পাশেই লাঠিয়ালদের থাকার ব্যবস্থা। লাঠিয়ালদের দেখলে মনে হয়, পাক হানাদার বাহিনীর সদস্য, রাজাকার, আলবদর। যেন যুদ্ধ শেষ হয়নি! এই য্দ্ধু চলবে যুগ থেকে যুগান্তর।

যুদ্ধ হয় সময়ের প্রয়োজনে। যুদ্ধ দেশ থেকে দেশান্তরের সংবাদ মাধ্যম। যে সংবাদ দেশ থেকে বিদেশে প্রচারিত হয়েছে এবং সেই সাথে দেশ স্বাধীনতা নামের সাইনবোর্ড তৈরী করে ঝুলে রেখেছে দেশের আনাচে কানাচে। এই গ্রামেও স্বাধীনতার সাইনবোর্ড ঝুলানো আছে। গ্রামের মানুষ স্বাধীনতার আগে বা পরের কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করে না।

পাক হানাদার বাহিনীর জারজ সন্তানেরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হলেও, তাদের রক্তে মিশে আছে, পাক হানাদার বাহিনীর রক্ত! দেহের রক্ত পরিবর্তন করা যায়না বলেই স্বাধীনতার পরে পাকিস্তানী প্রেমিকরা বাঙ্গালী সেজেছে, বাঙ্গালী হয়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নাম হয়েছে স্বাধীন বাংলার সুনাগরিক। “মুখোশ পড়ে রূপ পরিবর্তন করা যায় বটে, মনের রূপ পাল্টানো যায়না”। সেই শয়তান, হায়ানার দলের অনেক পাকিস্তানীই আজ দেশের নাম করা ব্যক্তি। “মানুষ নিজের চরিত্র পরিবর্তন করতে পারেনা, পরিবর্তন হয় খোলসে”। সেই খোলসে রূপ পরিবর্তন করে মহান নেতার মন কেড়েছে সেই নরপিচাশরা। মহান নেতার সরলতার সুযোগে খোলস পরিবর্তন করে খাদিমের মত মানুষও হয়েছে সুনাগরিক। আসলে খাদিম সেই হায়ানার সদস্য, পাকিস্তানী নরপিচাশ।

কুকুর-বিড়ালকে খাবার দিলেই পোষ মানে। নতুন মনিবকে দেবতার মত আগলে রাখে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর যে সব মানুষ আজও বাংলার মাটিতে বাংলার সবুজ শষ্য খেয়ে শরীরে লাল মাংস বাড়াচ্ছে, তাদের মন আজও দেশের সবুজ মাটিকে সম্মান করে না। মাতৃভূমির উপর দাঁড়িয়ে এখনও তারা অতীতের গান গায়। এখনও মনে মনে বলে পাকিস্তান জিন্দাবাদ! তারা হিং¯্র পশুর মত, যখন কোন স্বাধীনকামী মানুষকে পায়, ঘাড়ে কামড় লাগিয়ে ঝুলে থাকে; যতক্ষন প্রান না যায়। সেই মানুষ নামের নরপশু খাদিম গ্রামের নিরিহ মানুষদের উপর নির্যাতন করে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। পাকিস্তানী নরপিচাশ হানাদার খাদিমের বিশাল শরীরে শক্তিও প্রবল। গ্রামের সাধারণ মানুষ তার সাথে কথা বলতেও ভয় পায়। চিৎকার দিলে পাশে থাকা মানুষের কান স্তব্ধ হয়ে যায়। হাঁটার সময় মাটি কেঁপে উঠে, যেমন পুরানের রাক্ষুস।

তিন বেলায় খাদিম যা খায়, গ্রামের সাধারন মানুষের সাত জনের সংসার চলে। বড় মাছের মাথা, এক কেজি গরুর মাংস, এক কেজি আতব চালের ভাত খাদিমের এক বেলায় লাগে। মাসে একবার গোয়ালের গরু না কাটলে খাওয়ায় তৃপ্তি পায় না খাদিম। পুকুর থেকে ধরা বড় বড় রুই কাতলার মাথা, বিরাটাকার কাঁসার প্লেটে নিয়ে খাদিম গোগ্রাসে গিলে রাক্ষুসের মত।

খাদিমের একজন লাঠিয়ালের নাম রহমান। খারাপ লাঠিয়ালের সাথে দু একজন ভাল মানুষের স্থান হয়েছে খাদিমের লাঠিয়াল বাহিনীতে। নিজ সংসার চালাতে খাদিমের সকল অন্যায় অবিচার সহ্য করে চাকুরী করে। মাঝে মধ্যে খাদিমের মন মেজাজ ভাল দেখলে, রহমান কিছু বলার চেষ্টা করে।

খাদিম খেতে বসেছে। প্লেটের চারিপাশে নানা রকমের তরকারী। মাছ, মাংস, মাছের মাথা দিয়ে তৈরী মুড়িঘন্ট। চারিপাশে চার জন লাঠিয়াল দাস-দাসীর মত খাবার বিতরণ করে। বিরাটাকার ডাইনিং টেবিলের উপর থরে থরে খাবার সাজানো। খাদিম গ্রোগ্রাসে গিলছে। মাঝে মধ্যে তৃপ্তির ঢেকুর কাটে। করিমকে উদ্দেশ্য করে বলে রহমান, আহ্ কি স্বাধ! মাছের পেটিটার তেল যেন মুখে লেগেই আছে।

করিম লাঠিয়াল কথায় সায় দিয়ে বলল, জ্বি হুজুর পুকুরের মাছ। এমন মাছ এদতঅঞ্চলে নাই। মাছের বয়স তো হইছে হুজুর। একদম পুরাট হইছে হুজুর। যখন কাটছে তখন যদি দেখতেন, ভিতরটা হলুদ হয়ে গেছে।

ঠিক বলেছিস রে করিম।

রহমান মনিবের মুখের কথায় বাধ সাধে, হুজুর মাফ করবেন।

কি সমস্যা তোর রহমান, কথার মাঝে বাম হাত না ঢুকালে তোর ভাল লাগেনা বুঝি?

হুজুর আমি বলছিলাম যে, এত খাওয়া সঠিক নয়। আপনি তো মজা করে খান। এটা সীমা লঙ্ঘন হুজুর। গরীবের হক নষ্ট করছেন আপনি, হুজুর।

তুই দেখি সীমাও বুঝিছ। বল দেখি, কোন সীমা লঙ্ঘন হলো তোর?

হুজুর, সব বিষয়েই সৃষ্টিকর্তা সীমা দিয়েছেন। আপনি যেভাবে খাবার খান! কমপক্ষে দশ জনের খাবার!। খাবারের হিসাব দিতে হবে।

খাবারের হিসাব! তুই হাসালি রে রহমান।

হুজুর সৃষ্টিকর্তার হিসাব খুব কঠিন। এমনিতেই রমজান মাস। সায়োমের মাস। সংযমের মাস, আপনি এভাবে খাচ্ছেন! কেউ না দেখুক আল্লাহ তো দেখছেন। কোন কিছুই অতিরিক্ত ভাল নয়। গ্রামের কত লোক না খাইয়া থাকে, আপনি একাই দশ জনের খাবার সাবার করেন, এটা কি সীমা লঙ্ঘন নয় হুজুর?

খাদিমের মন মেজাজ আজ ভাল। তিনি রহমানকে বকলেন না। বললেন কেনরে? আছে বলেই তো খাই। আল্লাহ আমাকে দিছে খাবার জন্য, ভোগ-বিলাস করার জন্য। না হলে আমাকে এত সম্পদ দিয়ে আল্লার লাভ কি বল? তোকেও দিতে পারতো? আজ তুই আমার বাড়িতে কাজ করে জীবন চালাইতেছিস। এটাই তো নিয়ম।

রহমান অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলল, হুজুর আপনি রাগ করবেন না। আল্লাহ আপনাকে দিছে বলেই কি আপনি খাবে? ভোগ করবেন! আল্লাহ নিশ্চয় আপনাকে এত সব নিজের জন্য দেননি। আপনার অছিলায় অন্যদের হক আপনার কাছে মজুদ রাখছেন আল্লাহ। আপনি উপলক্ষ্য মাত্র। কোন বিলাসীতাই ভাল নয়। আজ আছি কাল নেই। বেশী খাইলেও মানুষ বাঁচে, কম খাইলেও বাঁচে, শুধু জিহŸার স্বাধের কম-বেশী। “বাঁচতে হয় বিধায় আমরা খাই, খাইতে হবে বইলা বাঁচবো, তা হয়না”। আজ আপনার শরীরে শক্তি আছে বলেই এমনটা বলছেন, কাল এমনটা নাও থাকতে পারে! গ্রামের কত লোক না খেয়ে আছে, আপনি জানেন হুজুর? জানেন না! জানলে এমনে বলতেন না! হাজার হাজার মানুষ না খাইয়া থাকে কিন্তু আপনি?

আমি না হয় একটু বেশী খাই। না খেলে এত বড় শরীর চলবে কি করে রে গাঁধা! শরীরকে প্রাপ্য খাবার তো দিতে হবে। এই বড় শরীর কি আমি বানাইছি?

খাদিমের পরামর্শক মোফাচ্ছের হাওলাদার। খাদিম, হাওলাদার বলেই ডাকে। হাওলাদার এতক্ষন দুই জনের কথোপকথন শুনতে ছিল। হাওলাদার ভাবছে, রহমান এত কথা জানে কিভাবে? তারপরও খাদিম সাহেবের সাথে এমন ভাবে কথা বলা সত্যিই সাহসের ব্যাপার! গুটিয়ে রাখা হাওলাদার দুই জনের কথার মাঝে বলল, হুজুর আপনাকে আজ খুব প্রফুল্ল মনে হচ্ছে।

আমি তো সব সময় এমনিই থাকি।

তা ঠিক আছে, তবে-

তুইও কিছু বলবি নাকি? বল, আজ খেতে খেতে জ্ঞানের কথা শুনি।

হুজুর, রহমান যে সীমার কথা বারবার বলার চেষ্টা করছে, তা কিন্তু সত্যি। কিছু কথা আছে আমাদের শুনতে ভাল লাগে, মানতে পারিনা। আমাদের মেনে চলা উচিৎ। হুজুর, আপনার সংসারে আপনি যা বলেন, তাই নিয়ম! না মানলে আপনি কঠিন বিচার করেন তাই না?

অবশ্যই তাই।

ঠিক তেমনি আল্লাহ’র সংসারের নিয়ম না মানলে, তিনিও কঠিন বিচার করবেন, তেমনটিই সঠিক।

কথা হচ্ছিল খাবারের সীমা নিয়ে। আমার স্বল্প জ্ঞানে যা মনে করি তাই বলছি। নিজেকে জাহির করছি মনে করবেন না হুজুর। আপনার নুন খেয়ে আছি।

আরে বল, শুনতে তো দোষ নাই।

হুজুর কোরআন মজিদে হারাম হালাল বলে দুটি কথা আছে। হালাল হলো পবিত্র, যা মানুষের জন্য বিশুদ্ধ হিসাবে আল্লাহ গ্রহনে নির্দেশ দিয়েছেন এবং হারাম হলো কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ, যা গ্রহনে আল্লাহ কঠোর ভাবে নিষেধ করেছেন। কেউ যদি হারামকে হালাল হিসাবে গ্রহন করে আল্লাহ’র সাথে চ্যালেঞ্জে নামে, তিনি নিশ্চয় প্রতিশোধ নিবেন। আপনি খেয়াল করলে বুঝবেন, যে খাবারটি শরীরের জন্য ক্ষতিকর, আল-কোরআনে সেই সকল খাবারকে হারাম করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হারাম হালালের বেশ কিছু নিদর্শন দিয়েছেন, যেমন পশু পাখির মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রও কিছু বিশেষ নিদর্শন প্রদান করেছেন। বিশেষ করে বড় দাঁতওয়ালা হিং¯্র প্রাণী, বুকে ভর করে চলে এমন প্রাণী, লাফিয়ে লাফিয়ে চলে এমন প্রানী বা পাখি, জিহŸা দিয়ে পানি খায় এমন প্রানী যেমন বাঘ-সিংহ, সাপ, কুকুর,বিড়াল, শুকুর, কুমির, কচ্ছপ, সজারু, বানর ইত্যাদি। পাখির মধ্যে ঈগল, বাজ, পেঁচা এরূপ অনেক। যেমন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন এমন প্রানী খাওয়া যাবেনা যারা নখ দিয়ে শিকার করে। হাদিসে উল্লেখ্য আঝে মেযন ইঁদুর, সাপ, টিকটিকি বিচ্ছু, কাক চিল হুুদ হুদ দোয়েল ব্যঙ, পিঁপড়া মৌমাছি ইত্যাদি। আরও উল্লেখ্য করেছেন “আর তোমরা তা থেকে আহার করোনা যার উপর আল্লাহ’র নাম উচ্চারণ করা হয়নি সুরা আনআম (আয়াত ১২১)। আল্লাহ তাআলা বলেন ” আর তোমরা তা থেকে আহার করোনা যার উপর আল্লাহ’র নাম উচ্চারণ কর হয়নি এবং নিশ্চয় তা সীমা লঙ্ঘন”। আবারও উল্লেখ আছে যেসব পশু প্রানী ও পাখির শরীরে প্রবাহিত রক্ত নেই সেগুলো খাওয়ায় হারাম, যেমন তেলাপোকা। হালাল খাবার হওয়া সত্বেও যদি কোন কারণে আপনার শরীরের জন্য খাবারটি ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে কি আপনার জন্য নিষিদ্ধ হবেনা? কঠোর নিষিদ্ধ খাবার গ্রহন করলে মানুষের অপুরনীয় ক্ষতি হয়। হয়ত অনেকেই হারাম খাবার খাচ্ছে এবং দর্প করে বলছে, “কৈ কিছুই তো হয়না!” কিন্তু যখন হয়, তখন হয় মহামারী। যেমন শুকরের মাংস খাওয়া আল-কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হারাম করেছেন। দম্ভ করে মানুষ শুকরের মাংস খায়। যেখানে প্রমানীত যে, শূকর দীর্ঘ ইনফ্লুইঞ্জার আদর্শ প্রজননস্থল। সা¤প্রতিক হুমকি সোয়াইন ফ্লু শূকরের মধ্যে উম্ভূত হয়েছে। অনুজীবী এবং রোগের অনাক্রম্যতা বিশেষজ্ঞ ডাঃ গ্রাহাম বারগেস, জেমস কুক ইউনিভার্সিটি, কুইন্সল্যান্ড অস্ট্রলিয়া, বলছেন “যে ভাইরাস মুরগির মধ্যে স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তা শূকরের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে বৃদ্ধি পায় এবং যে ভাইরাস মানবদেহে স্বাভাবিক গতিতে বৃদ্ধি পায় তা শূকরের দেহে প্রচ্ছন্ন গতিতে বৃদ্ধি পায়। শূকর হলো ভাইরাসের একটি বিশাল মিশ্রণপাত্র আর এই স্থল নতুন ভাইরাস গঠনে একটি বাস্তব ভূমিকা পালন করে”। শূকর প্যারাসাইট, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত। সিস্টিসারকসিস শূকরের ফিতাক্রিমি হতে সৃষ্ট একটি সংক্রমণ। যখন ফিতাক্রিমি শূকরের শরীরে প্রবেশ করে সিস্টিসিরসাই তৈরি করে তখন সংক্রমণ ঘটে। সিডিসি সতর্ক করে বলছে, যদি কেউ সংক্রামক ট্রাইকিনেলা সিস্টপূর্ণ মাংস খায় তাহলে পাকস্থলির কোষের শক্ত আবরণটিকে গলিয়ে দেয় এবং ক্রিমি গুলিকে নিস্ক্রিয় করে দেয়। ক্রিমি গুলি ক্ষুদ্রান্ত্রের মধ্যে থাকে এবং ১-২ দিনের মধ্যে পরিণত হয়। মিলনের পর প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-ক্রিমিগুলি ডিম দেয়। এই ডিম গুলি অপরিপক্ক কীটের আকার ধারণ করে, ধমনিতে ভ্রমণ করে এবং পেশীর মধ্যে পরিবাহিত হয়। পেশীর মধ্যে ক্রিমি গুলি একটি বলের মধ্যে কুঞ্চিত এবং একটি কোষের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যায়। শূকর সর্বভুক প্রাণী, অর্থাৎ তারা উদ্ভিদ এবং প্রাণী উভয়ই গ্রাস করে। শূকর মৃত পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ, গাছের বাকল, পচা মৃতদেহ, আবর্জনা, এমনকি অন্যান্য শূকর সহ সব ধরনের খাদ্য খায় এবং ময়লা আবর্জনা নিঃসরণ করে। শূকরের খুব কম ঘর্মগ্রন্থি আছে, তাই তারা তাদের দেহকে সম্পর্ন টক্সিন মুক্ত (বিষমুক্ত) করতে অক্ষম। শূকর ঘনঘন এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী স্ট্যাফ ব্যাকটেরিয়া পোষণকরে। এই ড্রাগ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া এখন আমাদের খাদ্য সরবরাহের মধ্যে প্রায় ঢুকে পড়ে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি সা¤প্রতিক তদন্ত থেকে জানা যায় যে, ৪৯% শূকর এবং ৪৫% শূকর-শ্রমিক এই ব্যাকটেরিয়া গুলি পোষণ করে, যার ফলে প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের ১৮০০০-এর থেকে বেশি মানুষ মারা যায়।

তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্দেশ মোতাবেক সকল হারাম খাবারকে বর্জন করতে হবে। তা না হলে বিশ্বে মহামারি হবে এবং তা কেউ রুখতে পারবেনা।

আপনি খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন, হার্টের রোগ বা ডায়াবেটিস হলেই ডাক্তার সেই খাবার গুলি বন্ধ করে দেন, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। মানেই উক্ত খাবার গ্রহনে তিনি সীমা লঙ্ঘন করেছেন। আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন খাবারের সীমা সঠিক রাখার জন্যই বছরে এক মাস রোজার ব্যবস্থা করেছেন। রোজা হলো শরীরের যাকাত। রোজা শরীর সেবার উত্তম ব্যবস্থা। শরীর সেবা উত্তম ইবাদত। শরীর সুস্থ্য না থাকলে বেঁচে থাকা অর্থহীন। রোজা শরীর সুস্থ্য রাখার মহাঔষধ। রোগ হলে যেমন সকাল বিকাল বড়ি খেতে হয়, ঠিক তেমনি মানব দেহ ও আত্মাকে সুস্থ্য রাখতে এবং খাবারের বন্ঠন সঠিক রাখতে বছরে ত্রিশ দিন রোজা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বড়ি হিসাবে পাঠিয়েছেন। সঠিক ভাবে রোজা পালন করলে, শরীরের রক্তের চর্বি কমে। রক্ত নালীর চর্বি কমে রক্তের প্রবাহ সঠিক করে। এক প্রকার ব্যঙ আছে, মাটির তলে ছয় মাসের নিদ্রা যায়। ছয় মাস শরীরের চর্বি ভেঁঙ্গে শক্তি উৎপন্ন করে। ব্যাঙ দিব্যি বেঁচে থাকে। ব্যাঙ মাটির তলে নিদ্রায় না থাকলে হয়ত মরে যাবে! বিধাতার নির্দেশ অবুঝ প্রাণী মানলেও, সর্ব শ্রেষ্ট জীব মানুষ মানেনা।

হুজুর দেখেন, আপনার ক্ষেতের দিকেই তাকান। ক্ষেতে যখন পরগাছা জন্মায় তখন খালেক চাচা জমিতে পানি বা সার দিতে দেয় না। পানির অভাবে জমি ফেটে চৌঁচির হয়। তখন খাদ্যের অভাবে ধান গাছ গুলি নিস্তেজ হয়। আপনি গত বছর খালেক চাচাকে রাগ করছিলেন। বলছিলেন, পানির কি অভাব পড়েছে? স্যালো মেশিন তো লাগানোই আছে! খালেক চাচা কি বলছিল? বলছিল, এখন পানি বা সার কোনটিই দেয়া যাবে না। এখন মাটি শুকাতে হবে। না শুকালে ফসল ভাল হবেনা হুজুর। উনি কেন বলেছেন বা উনি এর বিষয়ে কি জানতেন তা আপনি প্রশ্ন করেননি। আপনি উনার কথায় সায় দিয়েছিলেন।

হা ও তো ঠিক। আমি তো কৃষি কাজ সম্পর্কে তেমন জ্ঞান রাখিনা। তাই হয়ত কোন কথা বলেনি।

ঘটনাটি সত্যিই আজব। গ্রামের সাধারন কৃষকরা দেখে অথবা না বুঝে পূর্ব পুরুষের হাল ধরেই বছরের পর বছর এভাবে করে আসছেন কিন্তু ঘটনা কি ঘটে জানেন হুজুর?

বল।

জমি শুকনা রাখলে, খাদ্যের অভাবে জমিতে জন্মানো পরগাছা মরে যায়। এই সময় পানি ও সারের অভাবে শষ্য নিস্তেজ হয় বটে, জীবনি শক্তি হারায় না। পরগাছা পরনির্ভরশীল বলেই, খাদ্যের অভাবে মরে যায়। পরগাছা মরে যাবার পর, কৃষক হালকা নিড়ানী দিয়ে পরগাছা সমূলে ধ্বংস করে। পরবর্তীতে পানি ও সার প্রয়োগে শষ্য সতেজ হয়। শষ্য প্রানবন্ত হয়ে তুলনামূলক বেশী ফসল ফলায়। মানব দেহ তেমনি শষ্য ক্ষেত। যে ক্ষেতের মধ্যে কোটি কোটি উপকারী কোষের সাথে বাস করে পরগাছার মত ক্ষতিকর পরজীবি। যা শরীরের ভিতর বসবাস করে, শরীর সুস্থ্য রাখার জন্য খাবারের অংশ খেয়ে মানব দেহে বংশ বিস্তার করে। মানব দেহে তৈরী করে নানাবিধ রোগ। রোজা রাখায় প্রতিদিনের কমপক্ষে ১২-১৪ ঘন্টা খাবার না পেয়ে এবং এক টানা ত্রিশ দিনের খাবারের ঘাটতিতে, শরীরের পরজীবি মারা যায় এবং মানব শরীর রোগহীন সুস্থ্য থাকে। পরজীবিদের মারতে যে ঔষধ ব্যবহৃত হয় তাও দেখবেন একটা বিশেষ সময় অন্তর দেয়া হয়। যেমন দিনে ২ বার বা দিনে ১ বার। মানেই হলো ১২ ঘন্টা পর বা ২৪ ঘন্টা পরপর এবং ৩ দিন, ৫ দিন বা ৭ দিন। একটানা এভাবে পরজীবির উপর অত্যাচার করলে পরজীবিরা মরে যায়। রোজা হলো মানব দেহের পরজীবি মারার মহা ঔষধ।

বেশী খাইলেই শরীর কখনই সুস্থ্য থাকবেনা। মানব দেহের রোগের বেশীর ভাগ রোগের সৃষ্টি খাবার থেকে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কখনও ভাল কিছু বয়ে আনেনা। সেই রূপ বেশী খাবার খাওয়ায় শরীর সুস্থ্য তো থাকেই না বরং নানা রোগ বাসা বাঁধতে বাঁধতে এক সময় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। তাই শরীরে যা প্রয়োজন তাই দিতে হবে। বেশী খাইলে খারাপ কিছু ঘটবে এটাই স্বাভাবিক।