অভিবাসী শ্রমিকদের উপর কোভিড-১৯ এর প্রভাব বিষয়ে বিলস্ এর ওয়েবিনার

প্রকাশিত: 7:08 PM, September 19, 2020

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের অর্থনীতির দুই স্তম্ভের একটি টিকিয়ে রেখেছে বাংলদেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। এই অভিবাসী শ্রমিকদের সঠিক মর্যাদা, আইনী সহায়তা ও বিদেশে শ্রমিক প্রেরণে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার আহবান জানিয়েছেন সরকার, ট্রেড ইউনিয়ন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিল্স এর উদ্যোগে আয়োজিত “অভিবাসন এবং অভিবাসী শ্রমিকদের উপর কোভিড-১৯ এর প্রভাব: পুনরেকত্রীকরণ এবং কাজে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন (দেশে ও বিদেশে)” শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন।

অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যগণের জীবন-জীবিকার উপর কোভিড-১৯ এর প্রভাব পর্যালোচনা; কোভিড-১৯ এর কারনে অভিবাসী শ্রমিকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব; অভিবাসী শ্রমিকদের জীবন ও কাজের নিরাপত্তা (দেশে ও বিদেশে); বিদেশ ফেরত অভিবাসী শ্রমিকদের পুনরেকত্রীকরণে চলমান কার্যক্রম সমূহ পর্যালোচনা; কোভিড-১৯ এর কারনে অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য সহায়তা এবং করণীয় নির্ধারণে প্রণীত নীতিসমূহের ঘাটতি বিশ্লেষণ; অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং অধিকার নিশ্চিতকরণে করণীয় নির্ধারণ এবং অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য নতুন শ্রম বাজার তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে এ সভার আয়োজন করা হয়।

বিল্স চেয়ারম্যান মোঃ হাবিবুর রহমান সিরাজের সভাপতিত্বে এবং মহাসচিব নজরুল ইসলাম খানের সঞ্চালনায় আয়োজিত ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম হেড শরীফুল ইসলাম হাসান। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ শহীদুল আলম (এনডিসি)। সম্মানিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের যুগ্ম সচিব, পরিচালক (তথ্য প্রযুক্তি, গবেষণা ও পরিকল্পনা) নুরুন আখতার, রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেশন মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু) নির্বাহী পরিচালক ড. সি আর আবরার, শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরাম-এসএনএফ এর আহ্বায়ক ড. হামিদা হোসেন, বিল্স যুগ্ম মহাসচিব ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক রিনা রায়, আইওএম বাংলাদেশের মাইগ্রেশন গভর্নেন্স হেড শাহরীন মুনির, আইএলও সাউথ এশিয়ার ডিসেন্ট ওয়ার্ক টেকনিকেল টিমের ওয়ার্কার্স অ্যাক্টিভিটিস স্পেশালিস্ট সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ, আইএলও ঢাকার মাইগ্রেশন প্রজেক্ট চিফ টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার লেটেশিয়া ওয়েবেল রবার্টস প্রমুখ। এছাড়া মানিকগঞ্জের দুজন বিদেশ ফেরত শ্রমিক রাশিদা বেগম এবং আইয়ুব আলী তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।

মূল প্রবন্ধে শরীফুল ইসলাম হাসান বলেন, বিশ্বের ৮৪টি দেশে প্রায় এক কোটি ২৭ লক্ষ বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের মাধ্যমেই দেশের অর্থনীতি আজকের অবস্থানে। কিন্তু অভিবাসী শ্রমিকরা দেশে এবং বিদেশে নানা ধরণের হয়রানির শিকার হয়ে দেশে ফেরত আসছেন। কোভিড-১৯ সময়ে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশ থেকে ১ লক্ষ ২৭ হাজার শ্রমিক দেশে ফেরত এসেছেন। এছাড়া এসময়ে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ শ্রমিক বিদেশ যেতে পারেন নি। বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের পুনর্বাসনে ডাটাবেস খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ফেরত আসা শ্রমিকদের সুনির্দিষ্ট কোন ডাটাবেস নাই। ফেরত আসা শ্রমিকরা দেশে এসেও প্রয়োজনীয় লিগ্যাল সাপোর্ট পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন বাংলাদেশ থেকে যত শ্রমিক বিদেশ যাচ্ছে তার প্রায় অর্ধেক অদক্ষ যার ফলে শ্রমিকরা বিদেশ গিয়ে নির্ধারিত কাজ এবং প্রাপ্ত মজুরি পাচ্ছেন না। এছাড়া অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক পাঠানোর খরচ বেশি হলেও সে তুলনায় শ্রমিকরা মজুরি পাচ্ছেন না। অন্যদিকে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে বিদেশে কর্মসংস্থান অনেক কমেছে। তাই প্রত্যাবাসী শ্রমিকদের জন্য স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। ফেরত আসা শ্রমিকদের সমাজে সহজে আত্মীকরণে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ের সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সময় নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা করতে হবে এবং তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে মোঃ শহীদুল আলম (এনডিসি) বলেন, প্রতি বছর বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ২২ লক্ষ কর্মক্ষম মানুষ যুক্ত হলেও প্রায় ৭ লক্ষ শ্রমিক কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশ গমন করছেন। কিন্তু দক্ষ শ্রমিক কম। শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় কর্মসংস্থানের বিষয়টি যুক্ত করার ওপর জোর দেন তিনি। সরকার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি করে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য নতুন বাজার অনুসন্ধান করছে বলেও জানান তিনি।

বিদেশে মিশনের কার্যক্রম শক্তিশালী করতে প্রশিক্ষিত জনবল প্রেরণ করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের পরিবারের জন্য সুরক্ষার আওতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। যারা বিদেশে শ্রমিক পাঠাবেন তাদের কমপ্লায়েন্সের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি প্রবাসী শ্রমিকের অধিকারের বিষয়ে প্রচারণার জন্য মিডিয়াকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়ে বলেন, সচেতনতা জোরদারে ট্রেড ইউনিয়নকেও এগিয়ে আসতে হবে। এ ছাড়া প্রত্যাবাসী শ্রমিকদের তথ্য অ্যাপসের মাধ্যমে গ্রহণ করে জাতীয় ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করলে তা পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

কোভিড-১৯ সময়ে অভিবাসী শ্রমিকরা বড় ধরনের সংকটে পড়েছে উল্লেখ করে ড. সি আর আবরার বলেন, সরকারী নিয়ম কানুন মেনেই শ্রমিকরা বিদেশ গেছেন, সুতরাং তারা ফিরে আসার ক্ষেত্রে ন্যায্য পাওনা পাচ্ছেন কি না সেটি সরকার সহ সকল পক্ষকেই জোরালোভাবে দেখতে হবে। কলোম্বো প্রসেস সহ আন্তর্জাতিক চুক্তিসমুহ বিবেচনায় নিয়ে প্রবাসী শ্রমিকদের ন্যায্য দাবীর বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে জোরালোভাবে তুলে ধরার দাবী জানান তিনি। অভিবাসী শ্রমিকদের মর্যাদার বিষয়টি জোর বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারী খাতের প্রণোদনার মতো অভিবাসী শ্রমিকদের জন্যও অর্থ বরাদ্দ করা দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে দাবী নিয়ে এগিয়ে আসার প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। যে সমস্ত শ্রমিকরা টাকা জমা দিয়ে বিদেশ যেতে পারেন নি, তাদের টাকা বায়রাকে ফেরত দেয়া উচিৎ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান বলেন, শ্রমিকরা যে দেশে যাচ্ছেন সে দেশের আইন এবং নীতি অনুযায়ী শ্রমিকরা যা প্রাপ্য তা পাচ্ছেন না। শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে সকলকে কাজ করার ওপর জোর দেন তিনি।

রিনা রায় বলেন, কোভিড-১৯ এর কারনে সারা বিশ^ই এখন ক্ষতিগ্রস্ত। শ্রমিকরা চাকরি হারানোর ঝুঁকি, মজুরি ঝুঁকি এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এমনিতেই শ্রমিকদের নিরাপদ অভিবাসন, দেশে ফেরত আসা, মজুরি নিয়ে সমস্যায় ছিলেন কোভিড-১৯ এসে নতুন সমস্যা যুক্ত করেছে। অভিবাসী শ্রমিকদের জীবন মান সুরক্ষায় আইন এবং নীতি সংশোধনের উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, আমরা শ্রমিকদের পাঠানো রেমিটেন্স গুনি কিন্তু তাদের মর্যাদার বিষয়টি দেখি না। কোভিডের কারনে বিশ^বাজারে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে যারা কাজ হারিয়ে দেশে ফেরত এসেছেন তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। এজন্য সরকারকে তহবিল বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ভবিষ্যতে বাইরে যাবার চাপ বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেক্ষেত্রে মধ্যস্বত্তভোগীদের দৌরাত্ম কমাতে হবে। যারা ফিরে আসবেন তাদের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার দেয়া যায় কিনা সে বিষয়টিও ভেবে দেখার আহŸান জানান তিনি।

শাহরীন মুনির বলেন, নীতি-পরিকল্পনাকে উভয়মুখী হতে হবে যাতে করে তার আলোকে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়। আমাদের নীতি পরিকল্পনাগুলোকে বৈশ্বিক পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিবর্তন করে নিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গবেষণালব্ধ তথ্যের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ডাটাবেইসকে হালনাগাদ করা প্রয়োজন।

ল্যাটিশিয়া উইবেল রবার্টস বলেন, আইএলও’র উদ্যোগে বিদেশফেরতদের নিয়ে সাসটেইনেবল রিইনটিগ্রেশন প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। এটি সফল হলে আরও কার্যকর ভূমিকা নেয়া সম্ভব হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে সেখানেও রিইনটিগ্রেশন প্রকল্পকে যুক্ত করা হবে। উদ্যোক্তা প্রকল্পগুলোর সাথে যে সব বিজনেস মডিউলগুলোকে রাখা হবে বিদেশফেরত শ্রমিকরা সেগুলো থেকে তাদের প্রয়োজনীয়টি বেছে নিতে পারবেন।

স্বাগত বক্তব্যে নজরুল ইসলাম খান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি যে দুটি স্তম্বের উপর দাড়িয়ে আছে তার একটি রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সংকটকালীন সময়ে তাদের জন্য সরকার যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তা প্রশংসনীয়। তবে বিদেশে যেসব সেক্টরে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে সেখানে দক্ষ শ্রমিক প্রেরণে সরকারকে এখনই মনোযোগি হতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সভাপতির বক্তব্যে মোঃ হাবিবুর রহমান সিরাজ বলেন, আজকের আলোচনা থেকে যেসব সুপারিশ উঠে আসবে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে যাতে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।

টিএমএম/শ্রমিক দর্পণ