স্বাক্ষাৎকার: গার্মেন্টস কারখানার একজন ষ্টারের কাহিনী!

প্রকাশিত: 2:39 PM, September 14, 2020
কথা সাহিত্যিক ও লেখক র‌্যাক লিটন

স্বাক্ষাৎকারটি গ্রহন করেছেন শ্রমিক দর্পণের নিজস্ব প্রতিবেদক ইমরান হাসান নিলয়

ব্যস্ততার মাঝে, র‌্যাক লিটন এর সাথে কথা হয় আমাদের শ্রমিক দর্পণ এর সাংবাদিক নিলয়ের সাথে। বিভিন্ন আলাপচারিতায় র‌্যাক লিটনের জীবনী নিয়ে কথা শুরুর এক পর্যায়ে নিজ থেকেই তার জীবনের সংগ্রামের কথা উঠে আসে।

তার জীবনী নিচে তুলে ধরা হলো-

র‌্যাক লিটন এর পুরা নাম মোঃ রৌশন আলী খন্দকার লিটন। তিনি একজন কথা সাহিত্যিক এবং উপন্যাস এ তিনি র‌্যাক লিটন ব্যবহার করেন। গ্রামের বাড়ি মঙ্গাপিড়িত কুড়িগ্রাম জেলায়। পড়াশুনা শেষ করে কাজের সন্ধানে তিনি ঢাকায় পাড়ি জমান। ঢাকায় এসে আপন ছোট ভাই এর বাসায় আশ্রয় নেন। যেদিন তিনি ঢাকায় আসেন সেই দিনেই পত্রিকায় একটি চাকুরীর বিজ্ঞাপন দেখেন। পপুলার ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, ধানমন্ডি (প্রধান কার্যালয়) এ কম্পিউটার অপারেটর পদে। তিনি লিখিত ও সাক্ষাতকারে প্রথম স্থান অধিকার করে চাকুরীতে যোগদান করেন। তিনি বলেন ইন্টারভিই বোর্ডেই তার ৫০০ টাকা ইনিক্রিমেন্ট হয়েছিল। অত্যন্ত কৌতুহল বশতঃ জিজ্ঞাসায় তিনি বলেন, ইন্টারভিউ বোর্ডে ছিলেন মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালম ডাঃ মোস্তাফিজুর রহমান, তৎকালীণ এডমিন ম্যানেজার মিঃ সেলিম ও কাস্টমার সার্ভিস ম্যানেজার মোছাদ্দেক স্যার। ইন্টারভিউ বোর্ডে তার বেতন ধরা হয় ৩০০০ টাকা তিনি তাতেই খুশি ছিলেন কিন্তু কথা বার্তার এক পর্যায়ে মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয় বলেন, “তুমি পারবে! তোমার দ্বারা অনেক কিছু সম্ভব” এই বলেই মিঃ সেলিম এডমিন ম্যানেজারকে অতি উৎসাহের সাথে আরও ৫০০ টাকা যোগ করে দিতে বলেন এবং ১২ ফেব্রুয়ারী ২০০২ইং এ তিনি পপুলারের সাথে যুক্ত হয়ে চাকুরী জীবনের সূচনা করেন।

সেদিন থেকেই তার পথ চলা। তার চাকুরী জীবন ভালই চলছিল পপুলার ডায়াগনষ্টিক সেন্টার এ। অতি অল্প সময়ে তিনি মালিক সহ সকলের দৃষ্টির মধ্যে পড়েন এবং তিনি পরবর্তীতে কাস্টমার সার্ভিসেস অফিসার হিসাবে কাজ করেন। অত্যন্ত সফলতার সাথে তিনি তিন বছর কাজ করার পর, মিঃ র‌্যাক লিটনের মনে হয় যে, এখানে সর্বোচ্চ পদ হলো ম্যানেজার। এখানে থাকলে বড় হবার কোন সুযোগ নেই। তাই তিনি তৎকালীণ আরাম দায়ক ও সম্মানের চাকুরী ছেড়ে দেন। যদিও মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয় ও মাননীয় চেয়ারম্যান ম্যাডাম থাকে ছাড়তে রাজি ছিলেন না। উল্লেখ্য যে, পপুলার ডায়াগনষ্টিক সেন্টার এ চাকুরীকালীণ তিনি পপুলার নিয়ে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন এবং মাননীয় চেয়ারম্যান ম্যাডাম তার ৩০০ টাকা বেতন বৃদ্ধি করে দিয়েছিলেন এবং তিনি অত্যন্ত সম্মান দিয়ে বলেন যে, উপন্যাসটি পড়ার পর মাননীয় চেয়ারম্যান ম্যাডাম তাকে শুভেচ্চা জানাতে তার চেম্বারে এসেছিলেন।

পরবর্তীতে ২০০৫ সালের ২ অক্টোবর, তিনি পপুলার থেকে এসে ১৩৬ এ্যালিফেন্ট রোড, ধানমন্ডির অনন্ত গ্রুপের অনন্ত এ্যাপারেল লিঃ (গার্র্মেন্টস) এ কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর (শ্রমিক) পদে যোগদান করেন।

তিনি বলেন, কয়েকদিন চাকুরী করার পর একদিন সেন্ডেল পায়ে, তিনি তার ম্যানেজারের রুমে প্রবেশ করলে সেন্ডেল পা’য়ে দেবার জন্য তাকে ভৎসনা শুনতে হয়েছিল। যাই হোক পরবর্তীতে ১৮ দিনে মাথায় ফ্লোরের মাঝে কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর হিসাবে কাজ করতে দেখে মানব সম্পদ বিভাগের তৎকালীণ ম্যানেজার কাকলী ম্যাডাম তাকে “ম্যানেজমেন্ট ট্রেনি” হিসাবে নিয়োগ প্রদান করেন। ঠিক সেই সময় তার মনে পড়ে হারুন নামের একজন এডমিন অফিসার তাকে বলেছিলেন যদি আপনি ছয় মাস ভাল কাজ করতে পারেন, তাহলে আপনার ভবিষ্যত উজ্জ্বল। সেই অফিসারের কথাকে তিনি মুল ধরে কাজ করেন এবং এত কষ্ট তিনি তার জীবনে কখনও করেননি বলে তিনি উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে ম্যানেজমেন্ট ট্রেনি থেকে আইটি অফিসার পদে আইটি সেকশনে স্থায়ী নিয়োগ প্রদান করেন। তিন দিন আইটি সেকশনে ডিউটি করার পর তৎকালীণ অপারেশন জিএম কায়সার স্যারের কাছে তিনি বলেন যে, “স্যার এত ছোট জায়গা আমার ভাল লাগছেনা, আমাকে এমন জায়গায় দেন যেখানে বেশী কাজ করা যায়”। তার মনবল দেখে কায়সার স্যার তাকে এডমিন বিভাগে সরাসরি এডমিন অফিসার পদে যোগদান করান। উল্লেখ্য যে, ট্রেনি থাকাবস্থায় যারা তাকে গাইড করতো, তারা সবাই তার অধিনস্থ হয়ে যায় প্রথম দিনেই কারণ তারা সবাই ছিল সহকারী এডমিন অফিসার কিন্তু তিনি তাদেরকে কোন দিনই অসম্মান করেননি বরং এখনও তাদের স্বরণ করেন গর্ব ভরে।

২০০৭ সালে অনন্ত গ্রুপ দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে যায়। তখন তিনি তৎকালীণ মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয় ইনাম খানের গ্রুপ অনন্ত গ্রুপ (আশুলিয়া) এ চলে আসেন এবং কাকলী ম্যাডাম তাকে মানব সম্পদ বিভাগে যোগদান করান।

উক্ত অনন্ত গ্রুপেই কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর থেকে মানব সম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক হতে তার সময় লাগে মাত্র সাড়ে তিন বছর। তিনি বিভিন্ন সময় চড়াইউৎরাই পার করে সামনে এগিয়ে যান। তিনি সততার সহিত কাজ করেন এবং কোন অন্যায়ের সাথে আপষ করেন না বলেই চাকুরী জীবনে তাকে অনেকবার বড় বড় বিপদে পড়তে হয়েছিল কিন্তু তিনি অতি সম্মানে মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয় ইনাম খানকে স্বরন করে বলেন, “অনেক বার অনেকেই আমাকে বিপদে ফেলেছে, চাকুরী থেকে বের করার জন্য, মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয়কে বারংবার বিভিন্ন কথা বলে তাঁকে আমার উপর বিরক্ত করার চেষ্টা করতো। আমাকে মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয় তিনবার চাকুরী থেকে বের করার জন্য তাঁর রুমে ডেকেছিলেন। তিনবারেই আমার কথা শোনার পর মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয় আমাকে সাহস দিয়ে আরও পদোন্নতি দিয়েছেন এবং চতুর্থবার যেদিন আমার বিচার হয়, মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয় বলেছিলেন, লিটন আজ তোমাকে কেউ আটকাতে পারবেনা, তোমার চাকুরী আজ যাবেই। কিন্তু র‌্যাক লিটন অত্যন্ত সম্মান দিয়ে বলেন, এমডি স্যার কখনও এক তরফা বিচার করতেন না, তিনি দুই পক্ষের কথা শুনতেন এবং সামনে রেখে। তিনি চতুর্থবার যখন দেখলেন আমার কোন দোষ নেই, সেদিন তিনি বলেছিলেন “লিটন আজ থেকে তোমার কোন বিচার আমি করবোনা, তুমি সত্যিকারের মালিকের পক্ষে কাজ কর বিধায় তোমার এত শত্রু। তুমি তোমার কাজ করো এবং স্বাধীনভাবে।” সেই দিন থেকে আরও স্বাধীন ভাবে আমার পথ চলা। র‌্যাক লিটন অত্যন্ত আবেগ প্রবণ হয়ে কথা গুলি বলছিলেন এবং স্মৃতিচারণ করছিলেন। তিনি প্রকৃত পক্ষে মালিকের ভূমিকায় কাজ করেন বলেই চাকুরী জীবনে তাকে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে বলে তিনি জানান।

অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি মানব সম্পদ এর হেড কাকলী ম্যাডামের অধিনে থেকে অনন্ত পরিচালনা করেন এবং বিভিন্ন সময় মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয় ও চেয়ারম্যান মহোদয়ের হাত থেকে পুরস্কৃত হন।

মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মাননীয় চেয়ারম্যান এর কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহন করছেন র‌্যাক লিটন

তিনি ২০১০ সালে অনন্ত গ্রুপ থেকে চাকুরী ছেড়ে শিন শিন এ্যাপারেলস লিঃ এ যোগদান করেন এবং শিন শিন গ্রæপের চেয়ারম্যান মহোদয়ের অতি পছন্দের একজন হয়ে উঠেন। তিনি বলেন, একদিন চেয়ারম্যান স্যার সবাইকে র‌্যাক লিটনকে দেখিয়ে বলেছিলেন, আজ এই শিন শিন যে পলিসি  গুলি দিয়ে চলে, তার স্থপতি এই র‌্যাক লিটন। তিনি এই কথাকে গর্ব ভরে স্বরন করেন এবং মাননীয় চেয়ারম্যানকে অতিব সম্মান দেন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

পরবর্তীতে তিনি স্যামস এ্যাটায়ার লিঃ, সোয়াদ গার্মেন্টস ইন্ড্রাস্টিজ লিঃ, নারায়নগঞ্জ ইপিজেড এ চাকুরী করেন।

মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মাননীয় চেয়ারম্যান এর কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহন করছেন র‌্যাক লিটন

বর্তমানে তিনি বিশ্বের অন্যতম লিড প্লাটিনাম ফ্যাক্টরী এআর জিন্স প্রোডিউসার লিঃ, কাঠগড়া, জিরাবো, আশুলিয়া, ঢাকায় মানব সম্পদ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত আছেন।

মাত্র অল্প সময়ে তিনি গার্মেন্টস কারখানার সব চেয়ে ছোট পোষ্ট কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর থেকে মানব সম্পদ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার পদে উন্নতির পিছনে কি আছে, জানতে চাইলে র‌্যাক লিটন বলেন, “ আমার মুল তহবিল হলো “আমি পারবো, আমাকে পারতেই হবে” এবং সততা হলো আমার উন্নতির মূল চাবিকাঠি”। সজ্ঞানে কেউ তাকে দিয়ে কোন অসৎ কাজ করাতে পারবেনা বা এখন পর্যন্ত পারেনি। তিনি আর একটি কথা বিশ্বাস করেন যে, মানুষ তাই করতে পারে, যা পূর্বে মানুষ করেছে, আবার মানুষ তাও করতে পারে, যা এখন পর্যন্ত মানুষ করেনি”। তিনি অন্যায়ের সাথে আপষ করেন না এবং নিজেও আজ পর্যন্ত কোন অন্যায় কে প্রশয় দেননি। তিনি দর্ব করে বলেন, আল্লাহ তাকে সব সময় সাহায্য করছেন কারণ তিনি তিনটি জিনিস এড়িয়ে চলেন তা হলো রাগ, হিংসা ও লোভ। তিনটি জিনিসকে তিনি রপ্ত করতে পেরেছেন। তিনি মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, আমি ইনশাল্লাহ ভবিষ্যতেও কোথাও ঠেকবোনা।

উল্লেখ্য যে, তিনি গার্মেন্টস কারখানায় কঠোর পরিশ্রম করার পরে বিনিদ্র রাত্রি তিনি উপন্যাস লেখেন। এখন পর্যন্ত তার ৫টি উপন্যাস একুশে বই মেলায় প্রকাশ হয়েছে। তার ৫টি উপন্যাসেই দরিদ্র, নির্যাতিতদের নিয়ে লেখা।

প্রকাশিত তার ৫টি উপন্যাস যথাক্রমে দহনে সুখ, সেলাই আপা, অপরাহ্নে বিসর্জন, মঙ্গা ও সীমা-দ্য লিমিটেশন

প্রকাশিত তার ৫টি উপন্যাস যথাক্রমে দহনে সুখ, সেলাই আপা, অপরাহ্নে বিসর্জন, মঙ্গা ও সীমা-দ্য লিমিটেশন। অত্যন্ত সাবলিল ভাষায়, তিনি তার উপন্যাসে নির্যাতিতদের জীবনে তুলে ধরেছেন। তিনি তার লেখার জন্য বিভিন্ন সময় পুরস্কৃতও হয়েছেন।

উল্লেখ্য যে উপরোক্ত ভাষ্য আমরা পত্রিকায় ছাপবো বলে প্রথমত তিনি অমত করলেও আমাদের অনুরোধে রাজি হন।

আমরা শ্রমিক দপণ পরিবার, তার উন্নতিতে একাত্বতা করে মহান আল্লাহ’র কাছে তার দীর্ঘায়ু ও সুসাস্থ্য কামনা করছি, তৎসঙ্গে ভবিষতে উনি আরও জীবনের উন্নতি শিকড়ে যাবেন বলে প্রত্যাশা করছি।