শ্রমিকের ঈদ ভাবনা

প্রকাশিত: 1:53 PM, July 30, 2020

 

শ্রমিকের ঈদ ভাবনা
        -জেড এম কামরুল আনাম

যাদের জীবনে প্রতিদিন ক্ষুধা
চোখে আসেনা নিদ,
সে গরীব মানুষের ঘরে
কবে আসবে ঈদ।।

ঈদ মুসলিম সম্প্রদায়ের অতিব আনন্দের এবং গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় দিক থেকে এর গুরুত্ব অপরিসীম। মুসলিম সম্প্রদায় বছরে দুইটি ঈদ উদযাপন করে। রমজানের রোজার শেষে খুশির সওগত নিয়ে আসে ঈদ-উল-ফিতর।

মুসলমানেরা সাওয়ালের চাঁদ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। চাঁদ দেখা গেলেই পরের দিন যথা যোগ্য ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য ও উৎসাহ উদ্দীপনায় উদযাপন করে ঈদ-উল-ফিতর। রাত থেকেই শুরু হয় সুরের মুর্ছনায় “ রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ” এই সুর লাহুরী ভেসে বেড়ায় আকাশ বাতাস মুখরিত করে। এ যেন মন প্রান ভরে উঠে ঈদের আনন্দের রোশনাইয়ে।

ঈদ-উল-ফিতর আরবি শব্দ, যার অর্থ হচ্ছে উৎসব, আনন্দ বা খুশি। রমজান মাস হলো রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস। রমজানের অবসানে নতুন চাঁদ দেখা মাত্র ছোট-বড়, ধনী-গরীব, বাদশা-ফকির নির্বিশেষে সব মুসলমান এক কাতারে ঈদের নামাজ আদায় করে। ভালো ভালো খাবারের আয়োজন করে, একে অন্যকে মিষ্টি মুখ করে।

আগেকার দিনে ঈদের দিন এবাড়ি-সে বাড়ি আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে যেতে দেখা যেত। এ ঘরে সে ঘরে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতো। ছেলে মেযেরা নতুন জামা কাপড় পরে আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে যেতো। জামা কাপড় কিনে লুকিয়ে রাখতো কেউ যেন না দেখে অর্থাৎ ঈদের দিন পরে দেখাবে বা চমক দিবে। সারা দিন তারা ঘুরা ঘুরি করতো, আনন্দ করতো, সে যে কি খুশি আনন্দ উৎসবের আমেজ।

আজকাল মানুষের অর্থনৈতিক উন্নোয়ন হয়েছে বটে কিন্তু আনন্দ উৎসব দিনে দিনে ভাটা পড়ে যাচ্ছে। এখন আর সে আনন্দ উৎসব দেখা যায় না। মানুষের আন্তরিকতা কমে যাচ্ছে, মানুষ যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে।
মুসলিম সম্প্রদাযের আরেকটি ঈদের নাম ঈদ-উল-আযহা। ঈদ শব্দের অর্থ উৎসব আর আযহা শব্দের অর্থ ত্যাগ/বলিদান। ঈদ-উল-আযহা শব্দের অর্থ ত্যাগের উৎসব। মুসলিম সম্প্রদায়ের এটি দ্বিতীয় ধর্মীয় উৎসব। এটি আবার কুরবানির ঈদ নামেও পরিচিত। এই দিনটিতে মুসলমানেরা ফজরের নামাজের পর ঈদগাহে/মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করে ও অব্যবহিত পরে স্ব: স্ব: আর্থিক সামর্থ অনুযায়ী গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ, উট, দুম্বা আল্লাহর নামে কোরবানী করে।

ঈদ-উল-আযহা জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখে শুরু হয়, যা ১২ তারিখ পর্যন্ত থাকে। এই দিন সামর্থবানরা নামাজ শেষ করে আনুষ্ঠানিক ভাবে সম্পন্ন করেন কুরবানীর কার্যক্রম। চলে মাংস নিয়ে ব্যস্ততা, বিকেলে চলে আদর আপ্যায়ন বা বন্ধু বান্ধব/ আত্মীয় স্বজন/ রাজনীতিক বাড়িতে যাওয়া। চলে বিভিন্ন রকম ভোজের আয়োজন, যে খানে থাকে পলাউ, বিরানী, গরুর মাংস, খাসীর মাংস, ভেড়ার মাংস, মুরগীর মাংস, কোপ্তা, কালিয়া, বার-বি-কিউ আরো কত কি? এ সবই থাকে ধনী, উচ্চ এবং মধ্যবিত্ত পরিবারে। অবশ্য মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারেও তারা তাদের সাধ্যমত বাঙ্গালীর চিরায়ত সংস্কৃতি অনুযায়ী করে আয়োজন।

অন্য দিকে গতর খাটিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে আয় শ্রমিকেরা করে তা দিয়ে পরিবারের ভরণ পোষণ চালাতে হিম সিম খেতে হয়। শ্রমিকের আবার ঈদ, তাদের আবার ঈদ উৎসব তা কল্পনাও করা যায় না। শ্রম জীবী মানুষ যেহেতু তাদের কুরবানী করার সামর্থ নাই তাই তারা কখনো কখনো সামর্থবানদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কখনো কিছু পান কখনো শূন্য হাত। বাধ্য হয়ে হতাশা নিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে/ বন্ধু বান্ধব নিয়ে ঘুরতে বের হন বা বেড়াতে বের হন। সারাদিন এখানে সেখানে ঘুরাঘুরির মাধ্যমে কেটে যায় দিন। কেউ কেউ আবার দলবেঁধে ছুটে যান সিনেমা হলে, পার্কে বা হাতির ঝিলের মত জায়গায়। কেউ আবার টিভিতে সিনেমা, সিরিয়াল, গান বাজনা দেখে সময় কাটান। কেউ আবার তাস, কেরাম, লুডু ইত্যাদিতে মনোনিবেশ করেন একটু বিনোদনের আশায়।

“বিত্তশালীরা নতুন জামা পরে মাংস পলাউ খেয়ে
 দরজা বন্ধ করে টিভিতে সিরিয়াল যাচে,
শ্রমিক -কৃষক -দিন মজুরের খোঁজ রাখিবে কে,
এমন বান্ধব কি আছে?”

ঈদ হউক সার্বজনীন, ঈদ হউক সকলের। শ্রমিক-শ্রম জীবী মানুষ যেন ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে- এই উপলব্দি থেকে আসুন সকলে এগিয়ে যাই, ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করি এবং জীবনকে বৈচিত্রময় করে তুলি। সুন্দর জীবন গড়ি এবং জীবনকে মিথ্যা দূর্নীতিমুক্ত রাখি।

কবির সুরে বলি-
আজ ইসলামী-ডঙ্কা গরজে ভরি জাহান,
নাই বড় ছোট সকল মানুষ এক সমান।
রাজা প্রজা নয় কারো কেহ,
কে আমীর তুমি নওয়াব বাদশা বালাখানায়।

 

লেখক, কলামিস্ট ও  রাজনীতিবিদ