কর্মস্থল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি বন্ধে আদালতের নির্দেশনা: বাস্তবতা এবং করণীয়

প্রকাশিত: 12:44 PM, July 30, 2020

মো: আমানুল্লাহ আমান, শ্রমিক দর্পণ

যৌন হয়রানির ফলে একজন নারীর কর্মজীবনে বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি, মর্যাদাহানি এবং নারীর জীবনের সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে, নারীর পরিবারে দুঃখ- দুর্দশা, যন্ত্রণা ও অসম্মান ভোগ করে। তাই যৌন হয়রানি বন্ধে সরকারকে আইন, বিচার ও প্রশাসন রাষ্ট্রের এই তিন অঙ্গের সবকটি দ্বারা নারীর জন্য রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা প্রদানের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।

কর্মস্থলে যৌন হয়রানীর প্রতিকার পাবার জন্য ২০০৯ সালে বাংলাদেশের হাইকোর্ট একটি নির্দেশনা দিয়েছিল। সেখানে বলা আছে, কোন প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানীর অভিযোগ উঠলে সেটি তদন্ত এবং প্রতিকার পাবার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কিন্তু কর্মজীবী নারীদের এবং শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই হাইকোর্টের এই নির্দেশনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। ব্লাস্ট, ক্রিষ্টিয়ান এইড, নারীপক্ষ, এসএনভি মিলে সজাগ কোয়ালিশন করে পোশাক শিল্পে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে হাইকোর্টের এই নির্দেশনার উপর বেশ কিছু কাজ করেছে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যাকশন এইড, আওয়াজ ফাউন্ডেশন এ বিষয়ে কাজ করছে।

হাইকোর্টের এই রায়ের পর বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-ইউজিসি একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে দেশের সব সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। তাই যৌন নির্যাতন বন্ধে মাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই কমিটি গঠনে রাষ্ট্রের কঠোর নির্দেশ প্রয়োজন।

শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্র্তৃক গত ২০১৯ সালের ১০ জুন জেনেভাতে অনুষ্ঠিত সংস্থাটির ১০৮তম সেশনে ‘Elimination of Violence and Harassment in the world of work’ শীর্ষক কনভেনশন ১৯০-এ বিশ্বব্যাপী কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি নিরসনে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাবনা গ্রহণ করে। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বন্ধে এই কনভেনশনের প্রস্তাবনা একদিকে একটি শক্তিশালী ফ্রেমওয়ার্ক ও সুরক্ষা কবচ।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী ২০০৮ সালের ৭ আগস্ট কর্মস্থল এবং শিক্ষাঙ্গনে নারী ও শিশুদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধের জন্য দিকনির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে একটি মামলা করেন।

উক্ত মামলার প্রেক্ষিতে ১৪মে, ২০০৯ মহামান্য হাইকোর্টের মহামান্য বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও মহামান্য বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দীকী সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ একটি দিক নির্দেশনামূলক নীতিমালা প্রদান করেন।

এ নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো-

ক) যৌন নির্যাতন সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা;
খ) যৌন নির্যাতনের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা;
গ) যৌন নির্যাতন শাস্তিযোগ্য অপরাধ;

দিক নির্দেশনামূলক নীতিমালায় হাইকোর্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমসহ সব প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ নামে কমিটি গঠন করার আদেশ দেন।

হাইকোর্টের এ নির্দেশনা আইনে রূপান্তর না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ নির্দেশনাই আইন হিসেবে কাজ করবে এবং সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নীতিমালা প্রযোজ্য হবে। নীতিমালায় যৌন হয়রানি সংজ্ঞায় বলা হয়েছে;

যৌন হয়রানি বলতে বুঝায়-
 অনাকাঙ্খিত যৌন আবেদনমূলক আচরণ। যেমন-শারীরিক স্পর্শ বা এ ধরনের প্রচেষ্টা;
 প্রাতিষ্ঠানিক এবং পেশাগত ক্ষমতা ব্যবহার করে কারো সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্ট্রা করা;
 যৌন হয়রানি বা নিপীড়নমূলক উক্তি;
 যৌন সুযোগ লাভের জন্য অবৈধ আবেদন;
 পর্ণোগ্রাফী দেখানো;
 যৌন আবেদনমূলক মন্তব্য বা ভঙ্গি;
 চিঠি, টেলিফোন, মোবাইল, এসএমএস, ছবি, নোটিশ,কার্টুন, বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিল, নোটিশ বোর্ড, অফিস, ফ্যাক্টরী, শ্রেণীকক্ষ, বাথরুমের দেয়ালে যৌন ইঙ্গিতমূলক অপমানজনক কোন কিছু লেখা;
 প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হুমকি দেয়া বা চাপ প্রয়োগ করা;
 ভয় দেখিয়ে বা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক বা স্থাপনের চেষ্টা করা; ইত্যাদি।
যৌন হয়রানি রোধে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির পক্ষে অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নী ২০১০ সালের ২ নভেম্বর জনস্বার্থে হাইকোর্টে অপর একটি রিট করেন। দীর্ঘদিন শুনানির পর আদালত কয়েক দফা নির্দেশনাসহ রায় প্রদান করেন। এ ছাড়াও ২০১১ সালের ২৬ জানুয়ারি যৌন হয়রানি বন্ধে সাত দফা নির্দেশনাসহ রায় প্রদান করেন হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি মো. ইমান আলী ও বিচারপতি শেখ হাসান আরিফের দ্বৈত বেঞ্চ।
আদালতের এ বেঞ্চের দেয়া রায়ে বলা হয়, ইভটিজিং শব্দটি অপরাধের মাত্রা হালকা করে দেয়, এর পরিবর্তে সর্বস্তরে ‘যৌন হয়রানি’ শব্দদ্বৈতটি ব্যবহার করতে হবে। প্রতিটি থানায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য একটি করে সেল গঠনের আদালতের নির্দেশ ছিল। এ সেল প্রতি মাসে পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিবেদন পাঠাবে; কিন্তু এ সেলের অস্তিত্ব আছে বলে লক্ষ করা যায় না।

যৌন হয়রানী:কর্মস্থলে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিকারের কী পথ আছে এ বিষয়ে বিবিসি বাংলায় ২৮ অগাস্ট ২০১৯ইং এ একটি স্বাক্ষাতকারে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে একটি কমিটি থাকার কথা, সেখানে নারী সদস্য সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে। সে কমিটির যে কোন সদস্যের কাছে অভিযোগ করা যাবে। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে যিনি অভিযোগ করছেন এবং যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে – উভয়ের নাম গোপন রাখতে হবে। কমিটি উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনবে। “যিনি অভিযোগ করেছেন, তিনি যদি মনে করেন যে বিষয়টা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা যায়, তাহলে সেটা করা সম্ভব। যদি তিনি মনে করেন যে এটা সম্ভব না, এটা গুরুতর বিষয় তাহলে কমিটি পুরো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবার সুপারিশ করবে,” বলছিলেন সারা হোসেন।
এরপর কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা নিতে পারবে। এটা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কেউ যদি মনে করে যে তিনি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ন্যায় বিচার পাননি তাহলে সে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যে কোন পক্ষ আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে। সারা হোসেন বলেন, এর বাইরে গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে ভিকটিম পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে পারেন। তিনি বলেন, নারীদের উপর হয়রানির বিষয়গুলো অনেক প্রতিষ্ঠান সিরিয়াসলি না নেওয়ার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি সংক্রান্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে না।

বিদ্যমান অন্য যে সকল আইন যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষায় দিচ্ছে তা হলো-
 নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, যেমন ধর্ষণ, দল বেঁধে ধর্ষণ, ধর্ষণ চেষ্টা সংজ্ঞায়িত ও শাস্তিনির্ধারিত করা হয়েছে। নির্যাতনের ফলে আত্মহত্যায় বাধ্য করাও এর অন্তর্ভুক্ত। এ আইনের ১০ (২) ধারা অনুসারে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করবার অভিযোগে দুই থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।

 পারিবারিক সহিংসতা দমন ও সুরক্ষা আইন ২০১০ এ যৌন নির্যাতন সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
 ফৌজদারি দণ্ডবিধির ধারা ৩৫৪ এবং ৫০৯ যাতে যৌন নির্যাতন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
 পর্নোগ্রাফি আইন ২০১২,
 টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১,
 ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন ২০১৮-এ বিভিন্ন ধরনের যৌন হয়রানিকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারে।
 ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশ অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ এ নারীদের অশালীন কথা ও কটূক্তিকে অপরাধের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
 শ্রম আইন ২০০৬ (২০১৩ ও ২০১৮ তে সংশোধিত) এর আওতায় অশোভন আচরণ ও যৌন হয়রানির বিচার করা যায়।’
দেশের বিদ্যমান এইসব আইন সত্ত্বেও যৌন হয়রানির জন্য পৃথক ও সুনির্দিষ্ট আইনের প্রয়োজনীয়তা হাইকোর্টের নির্দেশনাতেই বলা হয়েছে।

যৌন হয়রানি বন্ধে আদালতের নির্দেশনার বাস্তবতা:
 দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, হাইকোর্টের নির্দেশনার এক দশক পরেও অধিকাংশ পাবলিক ও প্রাইভেট সেক্টরে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মিডিয়া আউটলেটগুলোতে যৌন নিপীড়ন অভিযোগ কমিটি তৈরি করা হয়নি। দেশের অধিকাংশ কল-কারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অভিযোগ কমিটিই নেই। আবার যে সব প্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন করা হয়েছে, বিভিন্ন কারণে সেগুলোকে অকার্যকর হয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।
 প্রতিটি থানায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য একটি করে সেল গঠনের আদালতের নির্দেশ ছিল। এ সেল প্রতি মাসে পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিবেদন পাঠাবে; কিন্তু এ সেলের অস্তিত্ব আছে বলে লক্ষ করা যায় না।
 হাইকোর্টের এসব নির্দেশনা থাকলেও বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তা মানছে না এবং এই নির্দেশ মানা ও না মানার বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে নেই কোনো নজরদারি।
যৌন হয়রানি বন্ধে আদালতে নির্দেশনায় যা করণীয়:
 যৌন হয়রানি সম্পর্কে সর্বস্তরে বিশেষত, কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার।
 শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকামণ্ডলীর মাঝে যৌন হয়রানি সংক্রান্ত আইন, প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা এবং আদালতের নির্দেশনা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
 সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাড়াতে হবে। যারা হাইকোর্টের নির্দেশনা মানেন না, তাদের ক্ষেত্রে জবাবদিহি করতে হবে।
 সচেতনতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তদারকি কৌশল প্রণয়ন করা।
 যৌন হয়রানি বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশনা নিয়ে রয়েছে অসচেতনতা। এ ক্ষেত্রে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে কার্যকর ভূমিকা।
 সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি শিক্ষাবর্ষের পাঠদান কার্যক্রমের শুরুতে এবং প্রতি মাসে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ওরিয়েন্টশনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং সংবিধানে বর্ণিত লিঙ্গীয় সমতা ও যৌন নিপীড়ন সম্পর্কিত দিকনির্দেশনাটি বই আকারে প্রকাশ করতে হবে।
 আদালতের নির্দেশনা যাতে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, সে জন্য সরকারি উদ্যোগে একটি তদারকি কমিটি থাকা উচিত। এবং
 গণপরিসরে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন করা।

দেশে যৌন হয়রানি যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে আমরা সবাই ঝুঁকিতে আছি। হাইকোর্টের এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে আমাদের দেশে যৌন হয়রানির মাত্রা কমে যেত বলে মনে করি।

লেখক- একজন উন্নয়নকর্মী।