‘কোথায় হারিয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ’

প্রকাশিত: 6:06 PM, July 20, 2020

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘করোনা মহামারী’তে মরছে মানুষ। জীবন-আশঙ্কা নিয়ে অসহায় দিন কাটাচ্ছে দেশের ১৮ কোটি মানুষ। মানুষের এই দুর্যোগের দিনে দেশের স্বাস্থ্য-চিকিৎসাসেবা কাজে নিয়োজিত কতিপয় নিকৃষ্ট ‘জানোয়ার’ মানুষের জীবন রক্ষার বদলে কোটি কোটি টাকার প্রতারণা ও লুটপাটের কারবারে লিপ্ত রয়েছে। সরকার পাটকল বন্ধ করে দিয়ে এহেন দুর্দিনে অগণিত শ্রমিককে বেকারত্বের মৃত্যুকূপে নিক্ষেপ করেছে। দেশকে ‘ফুলের বাগান’রূপে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে ’৭১-এ যারা জীবন বাজি রেখে মক্তিযুদ্ধের অমর অধ্যায় রচনা করেছিল, তারা কল্পনাই করেনি যে ৫০ বছর পর দেশের হাল এমন হবে। হারিয়ে গেছে কি আজ ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধ’?

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে তার শ্রেষ্ঠতম অর্জন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে জাতির সামনে প্রগতির পথে অগ্রসর হওয়ার এক অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গিয়েছিল। কালের অগ্রযাত্রার মাপকাঠিতে, দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে পিছিয়ে পড়ার গ্লানি মোচন করার সুযোগ জাতির সামনে সেদিন সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে জাতি কাজে লাগাতে পারেনি। তার একটি প্রধান কারণ, সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারার মতো উপযুক্ত শক্তি দেশের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত ছিল না।

মুক্তিযুদ্ধ একটি ‘জনযুদ্ধে’ পরিণত হয়েছিল। খেটে খাওয়া মানুষসহ সাধারণ মানুষের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ও জীবনপণ সংগ্রামের বিনিময়েই সেদিন এই যুগান্তকারী বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছিল। যে সামাজিক শ্রেণির শক্তির ওপর ভিত্তি করে সেদিনের এত বড় বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছিল, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব তাদের হাতে ছিল না। যারা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান অংশ, সেই শ্রমজীবী শ্রেণির হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব রাখা সম্ভব হয়নি। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছিল বুর্জোয়া-পেটিবুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল। সমস্যার মূল উৎস ছিল এখানেই।

স্বাধীন দেশে প্রথম সাড়ে তিন বছর এককভাবে ক্ষমতায় আসীন ছিল রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সে পদে পদে প্রদর্শন করছিল আপস, দোলাচল, আত্মসমর্পণ, সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার নিদর্শন। সরকারের যোগসাজশে দেশে গড়ে উঠেছিল একটি ‘লুম্পেন’ তথা পরগাছাসুলভ ‘নব্যধনিক’ শ্রেণি। মুক্তিসংগ্রামী জনগণের আকাক্সক্ষার সঙ্গে সরকারের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল খুব দ্রুতই। স্বাধীনতাবিরোধীরা পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। চলছিল তাদের ষড়যন্ত্র ও অন্তর্ঘাত। ক্ষমতাসীনদের ব্যর্থতা ও পরিস্থিতির নাজুকতার সুযোগে এই দেশদ্রোহী শক্তি ক্ষমতা দখল করে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছিল। রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মুক্তিযুদ্ধের’ বিপরীতমুখী ধারায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। গত সাড়ে চার দশক ধরে সেই ধারাতেই দেশ চলছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধকে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠতম অর্জন হিসেবে গণ্য করা হয় কেন? এ প্রশ্নের সঠিক জবাব জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কথা বুঝতে হবে যে, কেবল ভৌগোলিকভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারার মধ্যে ‘মুক্তিযুদ্ধের’ শ্রেষ্ঠত্বের কারণ সীমাবদ্ধ নয়। তার তাৎপর্য ও মর্মার্থ আরও অনেক গভীরে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধারা, অর্জন ইত্যাদি কথাগুলো ক্ষমতাসীন দলের সবাই কথায়-কথায় উচ্চারণ করে থাকেন। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই এসব কথার অর্থ ও তাৎপর্য যথার্থভাবে না বুঝেই সেগুলো মুখস্থ বুলির মতো এবং ‘কথার কথা’ হিসেবে উচ্চারণ করে থাকেন। মক্তিযুদ্ধের ‘আদর্শবোধের’ বিষয় নিয়ে দলে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, আলোচনা, চর্চা, অধ্যয়ন ইত্যাদি হয় না বললেই চলে। এসব কথাকে দলে পদ পাওয়ার জন্য ব্যক্তিস্বার্থের বাণিজ্যিক রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকে আজ ‘বাণিজ্যিকীকরণ’ করা হয়েছে। জনসমর্থন ছাড়াই ক্ষমতায় থাকার পথ তৈরি করার প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের এ ধরনের ‘বি-রাজনীতিকীকরণ’ করা হয়েছে।

পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে একাত্তরের সশস্ত্র সংগ্রাম ছিল ‘জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের’ ধারায় পরিচালিত অসীম সাহসী এক লড়াই। তা ‘পাকিস্তানকে দু-টুকরো করে’ দুটি পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী লড়াই ছিল না। এই লড়াইয়ের একটি প্রধান লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ পরিচালিত জাতিগত শোষণের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া। এর আরেকটি প্রধান লক্ষ্য ছিল সমাজ থেকে শ্রেণিগত শোষণ ও বৈষম্যের চির অবসান ঘটানো। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই ৩০ লাখ শহীদ আত্মবলিদান করেছিল এবং সমগ্র ‘জনগণ’ জীবনপণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এটিই যে ছিল মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য, সে কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণাও করা হয়েছিল। লড়াইটি ‘জনযুদ্ধে’ পরিণত হওয়ার ফলে এরূপ লক্ষ্য ঘোষিত হওয়া স্বাভাবিক ছিল।

যে লক্ষ্য নিয়ে জনগণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল সেই লক্ষ্য কী ছিল? তা কি ছিল, পাকিস্তানকে দ্বিখ-িত করে, তার বাঙালি অধ্যুষিত পূর্বাংশে পাকিস্তানের আদলে তারই একটি খ-িত নবসংস্করণ প্রতিষ্ঠা করা? না! মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া মানুষের লক্ষ্য তা ছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিলÑ পাকিস্তানের মতাদর্শিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক চরিত্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর এবং বিপরীত ‘চরিত্র-বৈশিষ্ট্য’সম্পন্ন একটি রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্য নিয়েই তারা মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়েছিল, লড়াই করেছিল, আত্মবলিদান করেছিল।

কয়েক যুগ ধরে ক্ষমতাসীনরা চেষ্টা করে যাচ্ছে যেন জনগণ মুক্তিযুদ্ধের মূল ‘চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের’ কথা ভুলে যায়। মুক্তিযুদ্ধের মূল পরিচয়কে ভুলিয়ে দিয়ে তারা আজ তার বদলে বিপরীতমুখী পাকিস্তানি ধারার পরিচয়কে প্রতিস্থাপন করেছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা মানুষের মন থেকে মুক্তিযুদ্ধের পরিচয়কে ভুলিয়ে দিতে পারেনি। শাহবাগের ‘গণজাগরণ মঞ্চের’ উত্থানের ঘটনায় তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

‘ধর্মের ভিত্তিতে জাতি গঠিত হয়’ – এই মতবাদকে ভিত্তি করে অবিভক্ত ব্রিটিশ-ভারতে গড়ে ওঠা ‘পাকিস্তান আন্দোলনের’ ফসল হিসেবে ১৯৪৭ সালে ভারতকে দুটি পৃথক রাষ্ট্রে বিভক্ত করা হয়েছিল। সৃষ্টি করা হয়েছিল পাকিস্তান নামের নতুন রাষ্ট্র। ভারতের পশ্চিমাংশ এবং সেখান থেকে ভৌগোলিকভাবে হাজার মাইল দূরত্বে অবস্থিত তার পূর্বাংশ, বিচ্ছিন্ন থাকা দুটি পৃথক অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির লক্ষ্যে গৃহীত ‘লাহোর প্রস্তাবে’ ভারতের মুসলিমপ্রধান পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে ‘একাধিক রাষ্ট্রের’ সমন্বয়ে পাকিস্তান গঠনের পরিকল্পনা হাজির করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জিন্নাহ সাহেব ‘টাইপ করতে ভুল হয়েছিল’ এই অজুহাত দেখিয়ে লাহোর প্রস্তাবের বহুবচনবোধক ‘একাধিক রাষ্ট্র’ ( states ) শব্দ পরিবর্তন করে অখ- ‘একক রাষ্ট্র’ ( state ) শব্দটি প্রতিস্থাপন করেছিলেন। এভাবে ‘শক্তিশালী কেন্দ্র’সম্পন্ন ও ‘ইউনিটারি’ রাষ্ট্রের ধারণাকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কেউ কেউ ‘লাহোর প্রস্তাবের প্রকৃত বাস্তবায়ন’ বলে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করে থাকেন। তাদের কথা অনুসারে, ধর্ম পরিচয়ের ভিত্তিতে জাতি গঠিত হয়। তাই মুসলমানরা একটি পৃথক জাতি। এই তত্ত্ব মেনে নিয়ে, সেই ভিত্তিতে ‘বাঙালি মুসলমানদের’ জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছিল। তারা বলার চেষ্টা করে থাকেন যে, মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে বাঙালি মুসলমানদের জন্য ‘পাকিস্তানের’ অনুরূপে একটি স্বাধীন ‘বাংলাস্থান’ বা ‘মুসলিম বাংলা’ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। কিন্তু এসবই হলো মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চরিত্র ও তার মর্মবাণীকে আড়ালে নিক্ষেপ করে জাতির কাঁধে আবার সুকৌশলে ‘পাকিস্তানি ভূত’ চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস মাত্র।

এই ঐতিহাসিক সত্যটিকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা, শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজ, গণতন্ত্র ইত্যাদি ছিল মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক ‘চরিত্র-বৈশিষ্ট্যগত’ ভিত্তি। রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সেই ‘চরিত্র-বৈশিষ্ট্য’ এখন প্রায় অপসারিত করা হয়েছে। তার জায়গায় ‘পাকিস্তানের’ ভূত আবার আমাদের কাঁধে চেপে বসতে পেরেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি প্রভৃতি বুর্জোয়া ধারার দলগুলো এজন্য প্রায় সর্বাংশে দায়ী।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানের ‘মানচিত্র’ ও ‘মতবাদ’ উভয় বিষয়কে নেতিকরণ (negate) করে নতুন ভিন্নতর ভিত্তির ওপর স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি ঐতিহাসিক লড়াই। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নতুন একটি ‘রাষ্ট্রীয়-ভূগোলকে’ বাস্তবে রূপ দেওয়ার পাশাপাশি, পাকিস্তানের কৃত্রিম ও প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শ ও ব্যবস্থা নাকচ করে, ভিন্ন বিপরীতমুখী বিকল্প প্রগতির ধারাকে অবলম্বন করে জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশ। এবং সে প্রগতির ধারাকে ভিত্তি করেই সূচিত হয়েছিল তার নতুন যাত্রাপথ। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা পাকিস্তান রাষ্ট্রের ‘বিবর্তনের’ ফসল ছিল না। তা ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে গুণগত ‘রূপান্তরের’ একটি প্রক্রিয়া।

এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় উত্তরণকালে সব সময়ই যুক্ত থাকে দুটি সমান্তরাল প্রক্রিয়া। তার মধ্যে একটি হলো ‘ছেদ’ ( discontinuity )-এর তথা গুণগত রূপান্তরের প্রক্রিয়া। এর পাশাপাশি বিরাজ করে একটি ‘অছেদ’ ( continuity )-এর তথা ধারাবাহিকতার প্রক্রিয়া। যে কোনো ‘উল্লম্ফন’ তথা মৌলিক ধরনের রূপান্তরের সময় প্রাধান্য থাকে ‘ছেদ’-এর প্রক্রিয়ার। কিন্তু ‘বিবর্তনের’ প্রক্রিয়ার সময় ‘অছেদ’-এর প্রক্রিয়াই হয় প্রধান। বাংলাদেশের জন্ম চরিত্রগতভাবে ছিল পাকিস্তান থেকে উল্লম্ফনের অর্থাৎ ‘ছেদ’ ঘটানোর একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের সময় সেই ‘ছেদ’-এর বিষয়টি সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্য না পেয়ে ‘অছেদ’-এর ধারাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর নবপ্রতিষ্ঠিত দেশ পরিচালনার ক্ষেত্র যে গুরুতর ত্রুটির মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। এটি ছিল একটি মৌলিক ধরনের ত্রুটি। অতীতের পাকিস্তানি ও ব্রিটিশ শাসনকালের সঙ্গে ‘ছেদ’ (discontinuity ) এবং ‘অছেদ’ ( continuity ) ঘটানোর প্রশ্নে, এ দুটির মধ্যে কোনটার কোথায় ও কতটুকু প্রয়োগ করতে হবে, সে ক্ষেত্রে উপযুক্ত ভারসাম্য স্থাপনে ত্রুটি ঘটেছিল। ‘ছেদ’-এর চেয়ে ‘অছেদ’কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল বেশি। ফলে পুরনো ব্যবস্থা ও ভাবাদর্শ ক্রমেই প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করেছিল।

কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটার পরও পুরনো ব্যবস্থা ও ভাবধারা আপনা-আপনি উধাও হয়ে যায় না। তা টিকেই শুধু থাকে না, নতুনের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার চেষ্টার ক্ষেত্রে সে প্রতিবন্ধকতাও সৃষ্টি করে। পুরনো দিনের ‘চলতি হাওয়ার’ স্বাভাবিক সুবিধার কারণে তার হাতে ‘ভাটিতে নৌকা বাওয়ার’ মতো বিশেষ সুবিধা থাকে। ফলে নিজেকে বহাল রাখা তার পক্ষে তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ হয়। নতুন ব্যবস্থা ও ভাবধারা প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাই প্রয়োজন হয় উপযুক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ও সুদৃঢ় অতিরিক্ত খাটুনি করা।

কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, আইনগত, রাষ্ট্রীয়-কাঠামোগত, সাংস্কৃতিক-সামাজিক-চেতনাগত ইত্যাদি ক্ষেত্রে সে কর্তব্যকে অবহেলা করা হয়েছিল। তা ছাড়া এমন সব অনুপযুক্ত ব্যক্তিদের রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো হয়েছিল যাদের খুব অল্প অংশই ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধা। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সম্পর্কে তাদের বেশিরভাগের ন্যূনতম জ্ঞান এবং ‘কমিটমেন্ট’ ছিল না। বরং তাদের অনেকেই তার প্রতি ছিল বৈরী মনোভাবাপন্ন।

মুক্তিযুদ্ধ ছিল প্রধানত জনগণের অর্জন। সেই অর্জন যে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছিল তার তাৎপর্য বোঝার ক্ষেত্রে এবং সেই পথে দেশের অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বুর্জোয়া-পেটিবুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বে পরিচালিত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছিল অক্ষম। অনেকে বলার চেষ্টা করে থাকেন যে, বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ছিল এই শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। কিন্তু সে সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে এ কথারও প্রমাণ মিলেছে যে, শেষ বিচারে কোনো ‘নেতা’ তার ‘দলীয়-ভিত্তির’ ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন না এবং কোনো ‘দল’ তার ‘শ্রেণি-ভিত্তির’ ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। সরকারের নানা সীমাবদ্ধতা, ত্রুটি-বিচ্যুতি, ব্যর্থতা ইত্যাদির সুযোগ নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ষড়যন্ত্র চালাতে ও তাদের চূড়ান্ত আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের নিষ্ঠুর হত্যাকা-ের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে তারা দেশকে মক্তিযুদ্ধের উল্টোমুখী পথে নিয়ে গিয়েছিল।

তার পর ৪৫ বছর পার হয়েছে। এ সময়কালে বিএনপি, জাতীয় পার্টি প্রভৃতি দলের শাসনকালে মুক্তিযুদ্ধের পথকে দূরে ঠেলে দিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত ধারার পথকে স্থায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী প্রমুখ স্বাধীনতাবিরোধী উগ্র সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট দল ও শক্তির উত্থান ঘটেছে। তাদের সঙ্গে এখন হেফাজতসহ আরও নানান শক্তি যুক্ত হয়েছে। এসব শক্তি দেশকে পুরোপুরি ‘নয়া পাকিস্তানে’ পরিণত করার জন্য সক্রিয় রয়েছে। আওয়ামী লীগ এই বিপদকে মুক্তিযুদ্ধকালের মতো সরাসরি মোকাবিলা না করে, ‘ক্ষমতার অঙ্ক’ মেলানোর জন্য তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে চলার ও ‘কৌশলগত ঐক্য’ করার নীতি অনুসরণ করছে। নব্বইয়ের পর আওয়ামী লীগ তিন-তিনবার ক্ষমতায় আসতে পারলেও দেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনেনি। সংবিধানসহ দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভাবাদর্শিক ইত্যাদি সব ক্ষেত্র থেকেই মুক্তিযুদ্ধ আজ নির্বাসিত। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অমর অর্জন নিঃশেষ হওয়ার নয়! রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে তাকে প্রায় সর্বাংশে বিতাড়িত করা হলেও তা এখনো জীবিত আছে কোটি কোটি মানুষের অন্তরের গভীরে। আরেকটি বিপ্লবী নবজাগরণের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে তা এখন উথাল-পাথাল করছে।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)