শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার ইতিহাস ও গণতন্ত্রের নায়ক

প্রকাশিত: 2:02 PM, July 20, 2020

নিজস্ব প্রতিবেদক

সন্তানের সাফল্যে রত্নগর্ভা হয়ে উঠেন একজন মা। তেমনই একজন সাধারণ মা রুছমতের নেছা যিনি মহিমান্বিত হয়েছেন সন্তানের বহুমাত্রিক অবদানের মাধ্যমে। মা আবেগ আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বলেন, আমার ছেলে রাজার মতো দেখতে ছিল। সবাই আমাকে বলতো চান-কপালের মা। সারাজীবন সে মানুষের উপকার করেছে। কখনো তাঁর কাছ থেকে কেউ নিরাশ হয়ে ফিরে আসেনি। আমার ছেলের মতো এই দেশে কোনো ছেলেই ছিলোনা। দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধে গেছে। আমি সারাদিন কান্নাকাটি করেছি। সবাইকে বলেছি ওকে একটু আসতে বলো যেন সোনা মুখটা একটু দেখে পিপাসার্ত চোখটা জুড়াতে পারি। ছেলে বলতো মা, কেঁদো না, আমি দেশকে স্বাধীন করার জন্য লড়ছি। ভালোই আছি।” মায়ের আদরের সেই ছেলেটি ছিলেন জনমানুষের শিক্ষক শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার।

মহা অর্জনের জন্য মহত্যাগ দরকার, বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ত্যাগ ছিল মানুষটির জীবনের ব্রত। দেশকে কেবল অকাতরে দিয়েছেন, বিনময়ে কিছুই চাননি। কখনো প্রতিদানের আশাও করেননি। একজন দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তিনি। স্বাধীনতা আন্দোলনে সম্মুখ যুদ্ধ করেছেন। তিনি তাঁর দলে প্রধান ছিলেন। একবার পাকিস্তানী হানাদাররা কানাগলিতে চারদিক থেকে তাদের আটকে ফেলে। তখনও সাহস আর মনোবল হারাননি। শরীরের কাপড় চোপড় খুলে স্টেনগান নিয়ে পাশের খালে ঝাঁপ দেন। খাল পার হয়ে সুরক্ষিত জায়গায় গিয়ে হানাদার বাহিনীর উপর আক্রমণ করেন। এই সম্মুখ সমরে পরাজিত হয়ে হানাদার বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।

শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার স্বাধীনতা আন্দোলনে মাটিতে ফেলে দিয়ে বুকে বেয়োনেট চার্জ করেছিল। তারই মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ক্ষত বিক্ষত মানুষটি তখনও দমে যাননি। ডান হাত দিয়ে বেয়োনেটটি সরিয়ে দেন। মুক্তিযুদ্ধে ক্র্যাম্বুশের মাধ্যমে যুদ্ধ করেছেন তিনি। ক্র্যাম্বুশ হলো বাংকার করে সেখানে আগে থেকেই গোলাবারুদ রেখে দেওয়া। দাঙ্গাবাজারে যখন হানাদারবাহিনী আক্রমণ করেছে তখন তাদের দলসহ সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে পাল্টা জবাব দেন তিনি। এরপর টঙ্গীর টিএসসিতে সশস্ত্র যুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে বড় একটি যুদ্ধ করেছিলেন ছয়দানায়।

কাশিমপুর থেকে মূল যুদ্ধটার সূত্রপাত ঘটেছিলো। মিত্রবাহিনী সাথে সন্মিলিত এই যুদ্ধে তিনি ও তাঁর দল ক্র্যাম্বুশ করে এসএল দিয়ে যুদ্ধ করেছেন আর শত্রূপক্ষকে ঘায়েল করতে গ্রেনেড ছুড়েছেন। এইভাবে হানাদার বাহিনীর একশোরও বেশি কমবো ধ্বংস করেছেন। এমনিভাবে প্রতিটি যুদ্ধে তিনি সম্মুখ থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অনুপ্রাণিতই করেছেন, সাহস জুগিয়েছেন। দেশপ্রেমিক এই মানুষটি শিক্ষা ও রাজনীতির এক অনন্য যোগসূত্র তৈরী করেছিলেন। শিক্ষা মানুষের জীবনকে বিকশিত করে। একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি ছিলেন তিনি। বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলে শিক্ষক হিসেবে তিনি স্বাধীনতার চেতনাকে ছাত্রদের মানসপটে তুলে ধরেছেন একজন নিখুঁত শিল্পীর মতো।

১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া হাই স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক (১৯৭৭-১৯৮৪) এবং প্রধান শিক্ষক (১৯৮৪-২০০৪) হিসেবে আমৃত্যু তাঁর যোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধার সমন্বয়ে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যেমন শিক্ষার্থীদের এই শিক্ষা দিয়েছেন, তাঁর নিজের জীবনেও তিনি এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর চিরচেনা সফেদ পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে তিনি সহজ-সরল জীবনের পরিচয় দিয়েছিলেন। শিক্ষক হিসেবে জীবনের ২৫টি বছর তিনি অতিক্রম করেছেন। তিনি ছিলেন শিক্ষকদের শিক্ষক। তিনি ছিলেন রাজনীতির শিক্ষক, রাজনীতিবিদদের শিক্ষক। তাঁর রাজনীতির মূল বিষয় ছিল মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা। তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী দেশপ্রেমিক একজন নেতার প্রতিকৃতি। তিনি গতানুগতিক স্বার্থবাদী রাজনীতির পরিবর্তে মানুষের কল্যাণের রাজনীতির দর্শনকে ধারণ করেছিলেন। তিনি রাজনীতির শিক্ষক এ কারণেই যে, তিনি মানুষের সেবার ব্রত নিয়ে ১৮ থেকে ২৪ ঘণ্টা কাজ করতেন। সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে থাকতেন আর আপন করে নিতে পারতেন সবাইকে।

সর্বজনীন নেতা হতে হলে তৃণমূলের মানুষের জন্য কল্যাণের রাজনীতি করতে হয় এটা তিনি প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছেন। জনগণের দাবির মুখে ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি গাজীপুরের পুবাইল ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন করেন। বিপুল ভোটে বিজয়ী হন তিনি। এরপর ১৯৯০ সালে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদ আসনে নির্বাচিত হন। বিপুল জনপ্রিয়তা ও মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসাকে ধারণ করে ১৯৯৬ সালে গাজীপুর-২ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে অপকৌশলের মাধ্যমে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে পরাজিত করা হলেও জনমানুষের অন্তরের নেতা শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার জাতীয় সংসদে গাজীপুর-২ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ ছাড়া জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এর আগে তিনি একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের চেয়ারম্যান ছিলেন। জাপানের একটি ঘটনা তাঁর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তাকে উদ্ভাসিত করে। জাপানি শ্রমিক নেতারা তাঁকে কিছু উপহার দিতে চাইলে তিনি তা আন্তরিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে জাপানের জাদুঘরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সংরক্ষণের কথা বলেছিলেন, যা আজ জাপানে গেলে সবার চোখে পড়বে। এটা ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁর প্রকৃত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

দেশপ্রেমকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষা, রাজনীতি, শ্রমের বিস্ময়কর মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন শ্রমিকদের শিক্ষক। তিনি ১৯৮৩, ১৯৮৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯০, ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পটভূমিতে শ্রমজীবী মানুষের শিক্ষক ও নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার, সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়ন, পেশাগত ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধ করার জন্য তিনি নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছেন। শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা হলে সেই মামলা লড়াইয়ের জন্য ও মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল গঠনসহ শ্রমিকদের বিভিন্নমুখী কল্যাণকর কাজের সঙ্গে তিনি নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন সমাজ, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের শিক্ষক। খুব গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, একটি সূদূরপ্রসারীপরিকল্পনার অংশ হিসেবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারকে। কারণ তিনি ছিলেন পরীক্ষিত দেশপ্রেমিক একজন রাজনীতিবিদ। কর্মী থেকে তিনি জননন্দিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন।
তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তী মহাপুরুষে। সে সময় বিএনপি জামাতের আগ্রাসনে মানুষ ভাবতে বসেছিল গণতন্ত্র আর হয়তো ফিরে আসবেনা। মুক্তিযুদ্ধের লড়াইয়ে তিনি যেমন সম্মুখ যোদ্ধা ছিলেন গণতন্ত্রের লড়াইয়েও তিনি ছিলেন সম্মুখ যোদ্ধা। গতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে রক্ত দিয়েছেন, অন্যায়ের শিকার হয়েছেন কিন্তু কোনোভাবেই এই মহান মানুষটিকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করা যায়নি। তিনি মাদক, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। কোনো অপশক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের আপস তিনি করেননি। তিনি এভাবেই মাটি ও মানুষের অধিকার রক্ষায় লড়াই করে গেছেন। অপশক্তি এটি মেনে নিতে পারেনি। তাকে হত্যা করলে গণতন্ত্রকে হত্যা করা যাবে বলে ভেবেছে। বুলেটের আঘাতে রক্ত ঝরেছে মানুষটির। মৃত্যুঞ্জয়ী হয়েছেন। তাঁর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে যে জনমানুষের জাগরণ ঘটেছিলো তা ইতিহাসে বিরল। জনতার এই প্রতিবাদ প্রতিরোধে পরিণত হয়, শোক পরিণত হয় শক্তিতে। এরই ধারাবাহিকতায় গণতন্ত্রের মানস কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ফিরে আসে গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের উত্থানে এই হত্যাকাণ্ডের দিনটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে ইতিহাসে বিবেচিত হয়েছে বলে এদেশের আপামর জনতা শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টারকে স্মরণ করতে এই কালো দিনটিকে জাতীয় জনজাগরণ দিবস ঘোষণার দাবি করেছেন। সকলের বিশ্বাস বঙ্গবন্ধু কন্যার মাধ্যমে জনমানুষের এই দাবিটি পূর্ণতা পাবে। খুনিরা শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টারকে হত্যা করেনি, তারা হত্যা করেছে স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী একজন নেতাকে।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও কলামিষ্ট
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

তথ্য সূত্র-পূর্বপশ্চিম