প্রাথমিক চিকিৎসা

প্রকাশিত: 1:35 PM, July 20, 2020

প্রত্যেক সচেতন ব্যক্তির “প্রাথমিক চিকিৎসা” সম্পর্কে জ্ঞান রাখা উচিৎ। অনেক সময় ক্লিনিক বা হাসপাতাল বাসার কাছে থাকলেও অনেক সময় হঠাৎ অসুস্থ্য ব্যক্তিকে সেখানে নেয়া সম্ভব হয়না। তাই যদি সকলের প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞান থাকে তাহলে আল্লাহ’র রহমতে অনেক রোগীকে মৃত্যুর কালো হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব। তাই নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে বিষদ আলোচনায় আসা যাক-

প্রাথমিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত সরঞ্জামাদীর ব্যাবহার বিধি

এন্টিসেপটিক সলিউশন (স্যাভলন)- ইহা জীবানু ধংশকারী বা জীবানু বিরোধী তরল পদার্থ। ইহা তুলাতে লাগিয়ে ক্ষত স্থান পরিস্কার করা হয়।

হেস্কিসলঃ ক্ষত স্থান পরিস্কার এর পূর্বে চিক্ৎিসকের হাত পরিস্কার করার জন্য ব্যবহার করা হয়।

কটোন(তুলা)- ইহা এক প্রকার পরিস্কার তুলা। শরীরের কোন ক্ষত স্থান ব্যবহার করতে ব্যবহার করা হয়। যেমনঃ কেঁটে যাওয়া, পুড়ে যাওয়া, ছিলে যাওয়া। স্যাভলন তুলাতে লাগিয়ে ক্ষত স্থান পরিস্কার করা হয়।

এন্টিসেপটিক স্যাভলন ক্রিম- ইহা জীবানু ধংশকারী বা জীবানু বিরোধী  মলম। কোথাও কেটে গেলে, পুড়ে গেলে, ছিলে গেলে ময়লা যুক্ত স্থান পরিস্কার করে এই ক্রিম ব্যাবহার করা হয়।

সিল ক্রিম- ইহা এন্টিসেপটিক ক্রিম। তবে বিশেষ করে পোড়া ঘায়ে এই ক্রিম ব্যবহার করা হয়।

সার্জিক্যাল গজ- ইহা জীবানু মুক্ত এক প্রকার কাপড়ের তৈরী। কোথাও কেটে গেলে, রক্ত ক্ষরন হলে ইহা ব্যবহার করা হয়। ইহা ক্ষত স্থান কে জীবানু মুক্ত রাখতে আবরন হিসেবে কাজ করে।

রোলার ব্যান্ডেজ- কোথাও কেটে গেলে, কোন আঘাতে রক্ত ক্ষরন হলে, সেখানে ভাল করে পরিস্কার তুলাতে এন্টিসেপটিক সলিউশন স্যাভলন লাগিয়ে পরিস্কার করে, তারপর এন্টিবায়োটিক ক্রিম ক্ষত স্থানে লাগিয়ে, তার উপর সার্জিক্যাল গজ রেখে এই রোলার ব্যান্ডেজ দিয়ে বেধেঁ দেওযা হয়, যাতে সেখানে জীবানু ঢুকতে না পারে অথবা রক্ত ক্ষরন না হতে পারে।

সার্জিক্যাল গ্লোভস- ইহা হাতে পরিধার করে কাঁটা, ছেড়া, পোড়া জায়গা পরিস্কার করা হয়।

সার্জিক্যাল সিজার- ইহা সার্জিক্যাল কাজে ব্যাবহার করা হয়। ইহা সার্জিক্যাল গজ এবং রোলার ব্যান্ডেজ ইত্যাদি কাঁটতে সাহায্য করে।

ফরসেফ- ইহা দ্বারা কোথাও কেটে গেলে, ছিড়ে গেলে, বা রক্ত ক্ষরন হলে পরিস্কার করার কাজে জীবানু মুক্ত তুলা বা গজ ধরা হয়।

ওর স্যালাইন- ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হলে অথবা বমি হলে মানুষের শরীরে পানি স্বল্পতা দেখা দেয়। এই পানি স্বল্পতা দূর করার জন্য মূলত প্রাথমিক অবস্থায় ওর স্যালাইন খাওয়ানো হয়।

নিউ স্টিপ- সামান্য কাঁটা ও ছেড়ায় স্যাভলন ওয়াশ দেওয়ার পর এন্টিসেপটিক মরম লাগিয়ে এ ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। ইহা এক দিন পর পর পরিবর্তন করতে হয়।

পভিসেপ ক্রিম- বেশি রক্ত ক্ষরন বা বেশি কেটে গেলে উক্ত স্থান পরিস্কার করে এই ক্রিম দিতে হয় তাই, উপরোক্ত বিষয় সমূহ সম্পর্কে সঠিক ভাবে জানা থাকলে যেখানে সেখানে সহজেই চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।

কেউ অজ্ঞান হলে তাৎক্ষনিক করণীয় বিষয়গুলি হলঃ
অজ্ঞান হওয়া ব্যক্তিকে একটি সমতল ভূমিতে শুইয়ে দিতে হবে। তার পাশে হাটু গেড়ে বসতে হবে। কপালে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে মাথাটি কাত করে দিন। তার মুখটি হা করে দিন । যদি সে শ্বাস নিতে না পারে তবে কৃত্রিম শ্বাস- প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করুন। তার চিবুক তুলে ধরুন যাতে চোয়াল সামনের দিকে যায়। মুখ খুলুন এবং নাকে দু আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিয়ে ধরুন। বড় একটি শ্বাস নিন এবং আপনার ঠোট দিয়ে তার মুখ চেপে ধরুন।এরপর আস্তে আস্তে তার মুখে শ্বাস ছেড়ে দিন । নিশ্বাসের সাথে তার বুক উঠানামা করছে কিনা লক্ষ্য করুন। যদি বুক উঠা নামা করে, তাহলে আপনার মুখটি সরিয়ে নিন। কিছুক্ষন সময়ের মধ্যে পর পর দুই বার শ্বাস প্রশ্বাস দিন এবং তার হার্ট বিট লক্ষ্য করুন। এরপর তাকে  হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করুন।

হার্ট বিট না থাকলে করুনীয় সবচেয়ে নিচের বক্ষের হাড় খুুজে বের করুন। ঘাড়ের মাঝামাঝি অংশ বের করুন। এক হাতের ঘোড়ালি ঘাড়ের মাঝামাঝি অংশের নিচে রাখুুুুুন এবং পাঁজরের নিচে ২ থেকে ৩ ইঞ্চি পর্যন্ত চাপ দিন, তারপর চাপ বন্ধ করুন। প্রতি সেকেন্ডে ২ বার ৩ থেকে ৬ বার চাপ দিন এবং একবার দম দিন। এভাবে মোট ৫ বারের পর একবার করে দম দিন যতক্ষন না পর্যন্ত হার্টবিট ফিরে আসে । হার্ট বিট ফিরে পেলে চাপ দেয়া বন্ধ করুন। কিন্তু কৃত্রিম শ্বাস- প্রশ্বাস বন্ধ করবেন না, যতক্ষন না পর্যন্ত নিজে শ্বাস নিতে পারছেন। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।

বিদ্যুতায়িত হলে বা কারেন্টে শক লাগলে বিদ্যুতায়িত ব্যক্তিকে মাটিতে শুইয়ে মাথা এক পাশে কাঁত করে দিন। কম্বল দিয়ে তাকে ঢেকে রাখুন যাতে সে উষ্ণ থাকে। যদি সে পিপাসা বোধ করে তবে তার ঠোঁটভেজা কাপড় দিয়ে ভিজিয়ে দিন। যদি সে অজ্ঞান হয়ে যায় তবে তার শ্বাস প্রশ্বাস লক্ষ্য করুন। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।

পুড়ে গেলে সাথে সাথে পোড়া অংশটি ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে নিন। যতক্ষন জ্বালা না কমে ততক্ষন আস্তে আস্তে পোড়া অংশে পানি ঢালুন। যদি ফোস্কা পড়ে তবে এক টুকরা পরিস্কার কাপড় (তুলা নয় এমন) দিয়ে জায়গাটি ঢেকে রাখুন। ফোস্কাটি ফাটাবেন না। কোন প্রকার ক্রিম বা লোশন ফোস্কা পড়া জায়গায় লাগাবেন না। সিল ক্রিম ব্যবহার করুন।

কাপড়ে আগুন ধরলে করনীয় অগ্নি নির্বাপক দ্বারা আগুন নিভিয়ে ফেলুন। ঢিলাঢালা কাপঢ় হলে খুলে ফেলুূন। শুস্ক যে সব কাপড় পোড়ার উপরে লেগে আছে তা খুলবেন না। পানির সাহায্যে পোড়া অংশটি ঠান্ডা করুন, ভূলেও পোড়া অংশে ঘষা দিবেন না। তুলা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে পোড়া অংশটি ঢেকে রাখুন।কি পরিমান আঘাত পেয়েছে তা বুঝে তাকে হাসপাতলে ভর্তির ব্যাবস্থা করুন।

প্রচুর রক্তক্ষরণ যদি প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় তবে আহত অংশটি তুলে ধরুন এবং চারপাশেচাপ দিন যাতে রক্ত ক্ষরন বন্ধ হয়। কিছুুক্ষনের জন্য চাপ বন্ধ করুন।রুমাল জাতীয় কোন কাপড় পেঁচিয়ে দিন।ক্ষত অংশের চারপাশে রুমাল বেঁধে দিন তাঁকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।

কেটে গেলে ডেটল বা সেভলন দিয়ে জায়গটি পরিস্কার করে নিন। যদি পাঁচ মিনিটি রক্ত পরা বন্ধ না হয়, তবে একটি প্যাড ক্ষতটির উপর কিছুক্ষন চাপ দিয়ে ধরুন। ড্রেসিং করে জায়গাটি বেধে রাখুন এবং পরিস্কার রাখুন । নাকে রক্ত আসলে তাকে একটি বেসিনের সামনে নিয়ে মিনিট দশেক নাকে চাপ দিয়ে রাখুন। এরপরও যদি রক্ত বন্ধ না হয় তবে একাট ভেজা কাপড় তার নাকে ২ মিনিটের জন্য চেপে ধরুন। এরপর আবার নাকে চাপ দিয়ে ধরুন। রক্ত পড়া বন্ধ হবার ঘন্টা চারেক পর্যন্ত নাক দিয়ে বাতাস বের না করতে বলুন।

মাথা বা মুখের ক্ষত যদি মাথা ফেটে যায় তবে ক্ষত অংশে একটি ভেজা কাপড় জড়িয়ে দিন। যদি মাথা হতে রক্তক্ষরন হয় তবে একটি পরিস্কার কাপড় ক্ষতের উপর চাপ দিয়ে ধরুন। তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।

খিচুুনি বা গিড়ার টান যেভাবে ভাল বোধ করে সেভাবে অংশটি রাখুন এবং তাতে বরফ শিতল পানি ঢালুন। গিড়ার চার পাশে তুলা দিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধুন।

চোখে ময়লা পড়লে কিছুক্ষন অপেক্ষা করে দেখুন স্বাভাবিক চোখের পানি দিয়ে ময়লাটি ধুয়ে যায় কি না! যদি তাতে ময়লা না যায়, তবে পর্যাপ্ত আলোতে চোখটি নিয়ে আসুন। যদি আলোয় কিছু পাওয়া যায় তাহলে শুক্ত কাপড়ের সাহায্যে ময়লা বের করুন। যদি আলোতে কিছু পাওয়া না যায়, তাহলে ঠান্ডা পানির ঝাটকা দিন। তাতেও কোন সুফল পাওয়া না গেলে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহন করুন।

লেখক- লায়লা সুলতানা,

সিনিয়র নার্স ওয়েলফেয়ার অফিসার
কুইন সাউথ টেক্সটাইল লিঃ