সীমা- দ্যা লিমিটিমেন-২

প্রকাশিত: 12:24 PM, July 20, 2020

তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্দেশ মোতাবেক সকল হারাম খাবারকে বর্জন করতে হবে। তা না হলে বিশ্বে মহামারি হবে এবং তা কেউ রুখতে পারবেনা।

আপনি খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন, হার্টের রোগ বা ডায়াবেটিস হলেই ডাক্তার সেই খাবার গুলি বন্ধ করে দেন, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। মানেই উক্ত খাবার গ্রহনে তিনি সীমা লঙ্ঘন করেছেন। আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন খাবারের সীমা সঠিক রাখার জন্যই বছরে এক মাস রোজার ব্যবস্থা করেছেন। রোজা হলো শরীরের যাকাত। রোজা শরীর সেবার উত্তম ব্যবস্থা। শরীর সেবা উত্তম ইবাদত। শরীর সুস্থ্য না থাকলে বেঁচে থাকা অর্থহীন। রোজা শরীর সুস্থ্য রাখার মহাঔষধ। রোগ হলে যেমন সকাল বিকাল বড়ি খেতে হয়, ঠিক তেমনি মানব দেহ ও আত্মাকে সুস্থ্য রাখতে এবং খাবারের বন্ঠন সঠিক রাখতে বছরে ত্রিশ দিন রোজা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বড়ি হিসাবে পাঠিয়েছেন। সঠিক ভাবে রোজা পালন করলে, শরীরের রক্তের চর্বি কমে। রক্ত নালীর চর্বি কমে রক্তের প্রবাহ সঠিক করে। এক প্রকার ব্যঙ আছে, মাটির তলে ছয় মাসের নিদ্রা যায়। ছয় মাস শরীরের চর্বি ভেঁঙ্গে শক্তি উৎপন্ন করে। ব্যাঙ দিব্যি বেঁচে থাকে। ব্যাঙ মাটির তলে নিদ্রায় না থাকলে হয়ত মরে যাবে! বিধাতার নির্দেশ অবুঝ প্রাণী মানলেও, সর্ব শ্রেষ্ট জীব মানুষ মানেনা।

হুজুর দেখেন, আপনার ক্ষেতের দিকেই তাকান। ক্ষেতে যখন পরগাছা জন্মায় তখন খালেক চাচা জমিতে পানি বা সার দিতে দেয় না। পানির অভাবে জমি ফেটে চৌঁচির হয়। তখন খাদ্যের অভাবে ধান গাছ গুলি নিস্তেজ হয়। আপনি গত বছর খালেক চাচাকে রাগ করছিলেন। বলছিলেন, পানির কি অভাব পড়েছে? স্যালো মেশিন তো লাগানোই আছে! খালেক চাচা কি বলছিল? বলছিল, এখন পানি বা সার কোনটিই দেয়া যাবে না। এখন মাটি শুকাতে হবে। না শুকালে ফসল ভাল হবেনা হুজুর। উনি কেন বলেছেন বা উনি এর বিষয়ে কি জানতেন তা আপনি প্রশ্ন করেননি। আপনি উনার কথায় সায় দিয়েছিলেন।

হা ও তো ঠিক। আমি তো কৃষি কাজ সম্পর্কে তেমন জ্ঞান রাখিনা। তাই হয়ত কোন কথা বলেনি।

ঘটনাটি সত্যিই আজব। গ্রামের সাধারন কৃষকরা দেখে অথবা না বুঝে পূর্ব পুরুষের হাল ধরেই বছরের পর বছর এভাবে করে আসছেন কিন্তু ঘটনা কি ঘটে জানেন হুজুর?

বল।

জমি শুকনা রাখলে, খাদ্যের অভাবে জমিতে জন্মানো পরগাছা মরে যায়। এই সময় পানি ও সারের অভাবে শষ্য নিস্তেজ হয় বটে, জীবনি শক্তি হারায় না। পরগাছা পরনির্ভরশীল বলেই, খাদ্যের অভাবে মরে যায়। পরগাছা মরে যাবার পর, কৃষক হালকা নিড়ানী দিয়ে পরগাছা সমূলে ধ্বংস করে। পরবর্তীতে পানি ও সার প্রয়োগে শষ্য সতেজ হয়। শষ্য প্রানবন্ত হয়ে তুলনামূলক বেশী ফসল ফলায়। মানব দেহ তেমনি শষ্য ক্ষেত। যে ক্ষেতের মধ্যে কোটি কোটি উপকারী কোষের সাথে বাস করে পরগাছার মত ক্ষতিকর পরজীবি। যা শরীরের ভিতর বসবাস করে, শরীর সুস্থ্য রাখার জন্য খাবারের অংশ খেয়ে মানব দেহে বংশ বিস্তার করে। মানব দেহে তৈরী করে নানাবিধ রোগ। রোজা রাখায় প্রতিদিনের কমপক্ষে ১২-১৪ ঘন্টা খাবার না পেয়ে এবং এক টানা ত্রিশ দিনের খাবারের ঘাটতিতে, শরীরের পরজীবি মারা যায় এবং মানব শরীর রোগহীন সুস্থ্য থাকে। পরজীবিদের মারতে যে ঔষধ ব্যবহৃত হয় তাও দেখবেন একটা বিশেষ সময় অন্তর দেয়া হয়। যেমন দিনে ২ বার বা দিনে ১ বার। মানেই হলো ১২ ঘন্টা পর বা ২৪ ঘন্টা পরপর এবং ৩ দিন, ৫ দিন বা ৭ দিন। একটানা এভাবে পরজীবির উপর অত্যাচার করলে পরজীবিরা মরে যায়। রোজা হলো মানব দেহের পরজীবি মারার মহা ঔষধ।

বেশী খাইলেই শরীর কখনই সুস্থ্য থাকবেনা। মানব দেহের রোগের বেশীর ভাগ রোগের সৃষ্টি খাবার থেকে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কখনও ভাল কিছু বয়ে আনেনা। সেই রূপ বেশী খাবার খাওয়ায় শরীর সুস্থ্য তো থাকেই না বরং নানা রোগ বাসা বাঁধতে বাঁধতে এক সময় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। তাই শরীরে যা প্রয়োজন তাই দিতে হবে। বেশী খাইলে খারাপ কিছু ঘটবে এটাই স্বাভাবিক।

বুঝলাম রে হাওলাদার।

এত কথা বললাম, মনে কিছু করবেন না। ছোট মুখে বড় কথা মানায় না। তারপরও অনেক কেশী বলে ফেলেছি। মনে কিছু করবেন না হুজুর।

শোন তোর কথা গুলি আমার কাছে সত্যি মনে হয়েছে। তবে মানতে বলিসনা। আমি মানতে পারবোনা।

নবী করিম (সাঃ) এর বর্ণনা মতে “যদি কোন ব্যক্তি রাতে আহার করে নিদ্রা যায় এবং তার চল্লিশ বাড়ির কোন একজন না খেয়ে রাত্রি যাপন করেন, তাহলে যে ব্যক্তি আরাম আয়াশে রাত্রি যাপন করেছেন, সে তাঁর উম্মতই নন”। মানুষ তাই করছে। মানবতার কথা খেয়ালে না রেখে শুধু সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনা করেই ক্ষ্যন্ত দেয়। সৃষ্টিকর্তা বলেছেন, “তুমি আমায় ভালবাসতে চাও, আমার সৃষ্ট জীবকে ভালবাস”। পাশের চল্লিশ বাড়ি তো দুরের কথা, পাশের বাড়ির খবর নেয়ার সময় হয়না কারও। সবাই শান্তনা পায়। দেশ অনেক উন্নত! এখন কেউ না খেয়ে থাকে না। মঙ্গায় জর্জরিত মানুষ গুলির দিকে কেউ তাকায়না। তাকানোর সময় নেই কারো। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোরআন মজিদে বলেছেন “তোমার সীমা লঙ্ঘন করোনা, আমি সীমা লঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করিনা”। তোমার যত টুকু দরকার তত টুকুই তোমাকে ভোগ করার অধিকার দেয়া হয়েছে। তুমি তোমার জন্য অপচয় করোনা। সেই মতে, একজন মানুষের শরীরে নির্ধারিত যে ক্যালোরী প্রয়োজন, তার বেশী খাদ্য গ্রহন অপব্যয় হিসাবে বিবেচিত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অপব্যয়কারীকে ক্ষমা করবেন না। আল কোরআনে অমিতব্যয়ী ব্যক্তিকে শয়তানের ভাই বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটা ইসলামের দৃষ্টিতে সীমা লঙ্ঘন হিসাবে নিন্দা করা হয়েছে। ইসলামের মিতব্যয়িতা প্রশংসনীয়। নিজ বিলাসিতা, অতিরিক্ত ভোগে নিজ জীবনে আরাম আয়েশে মত্ত, নিজ প্রয়োজনের তুলনায় অপচয় বা চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত খরচ করার দ্বারা একজন মানুষ সীমা লঙ্ঘনকারী হিসাবে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। নিজ শরীর ও মনের খোরাকে মিতব্যয়ীকে উৎসাহিত করেছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে “তোমাদের যে জীবন যাপন দান করেছি তা থেকে উত্তম অর্থ্যাৎ বৈধ বলে আহার কর এবং এ ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘন করনা, তাহলে তোমাদের উপর আমার গজব আপতিত হবে”। (ত্বহাঃ৮১)। অন্য এক জায়গায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন “প্রয়োজনীয় পানাহার কর, তবে অপব্যয় করা না (আরাফ-৩১)। আরও বলা হয়েছে “অপব্যয় করনা, নিশ্চয় আল্লাহ অপব্যয়কারীদের পছন্দ করেন না” আন-আম-১৪১।

ইসলামে নিজ খরচের ক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন “আর তারা মুমিনগণ যখন খরচ করে তখন অপব্যয় করেনা এবং এতদভয়ের মাঝে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে” (ফুরকান-৬৭)। ইসলাম নিজ কাজে মিতব্যয়িতার অভ্যাস তৈরীর মাধ্যমে বিত্তবান, সম্পদশালী ব্যক্তিদের নির্ধারিত সীমার মধ্যে রেখে মধ্য পন্থা অবলম্বন করে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার নির্দেশ করেছেন। নবী করিম (সাঃ) এক  হাদিসে বলেছেন “তোমরা যদি প্রবহমান নদীর ঘাটেও বসে থাক, তবুও পানির অবচয় করনা”।

খাদিমের মত ধনবান ব্যক্তিরা শুধু মাত্র নিজ স্বার্থ চরিতার্থে বারংবার সীমা লঙ্ঘন করে। নিজ শরীরকে সামর্থবান রাখতে যা খরচ করে তা দিয়ে গ্রামের অভাবী মানুষদের জীবন ধারণে ব্যয় করে অনেক মানুষই উত্তম জীবন যাপন করতে পারে। মঙ্গার করাল গ্রাসে গ্রামের হত দরিদ্র মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করলেও, খাদিমের বাড়িতে খাওয়া দাওয়ার কমতি হয়না। সব সময় ধুমধাম আনন্দ উল্লাসে মত্ত থাকে বাড়ির উঠান। প্রতিদিন অনাহারী মানুষের ঢল নামে খাদিমের বাড়ির পিছনে, যেখানে ভাতের মাড় ফেলানো হয়। বাড়ির চাকরেরা ভাতের মাড় বাড়ির পিছন দিয়ে গরীবদের বিলায়। সেই মাড় খেয়ে মঙ্গার দিন গুলি কাটে হতদরিদ্র গ্রামের মানুষের।

পর্ব-২

লেখক ও কথা সাহিত্যিকি র‌্যাক লিটন